অর্জুন দত্তর জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি ‘ডিপ ফ্রিজ’ মূলত দুই মানুষের ভেতরে জমে থাকা নীরবতার গল্প। এমন নীরবতা যা সম্পর্কের সমস্ত স্মৃতি, অভিমান, বিশ্বাসভঙ্গ ও অপূর্ণতাকে বরফের স্তরে ঢেকে দেয়। ছবি শুরু হয় এক বর্ষার রাতে—দু’জন বহুদিন পর এক ছাদের নিচে—কিন্তু আবারও অতীতের বরফ গলতে গলতে তৈরি হয় নতুন প্রশ্নের রেশ: সম্পর্ক কি সত্যিই ভেঙে যায়, নাকি অন্য রূপে বেঁচে থাকে?
এক রাতের গল্প, তবু অভিঘাত দীর্ঘস্থায়ী
স্বর্ণাভ এবং মিলি—এককালে ভালোবাসায় ভরা দাম্পত্য। একটি অনভিপ্রেত ঘটনার পর ভেঙে যায় তাদের সংসার। রয়েছে সন্তান তাতাই। জ্বরের খবর পেয়ে স্বর্ণাভ আসে প্রাক্তন স্ত্রীর বাড়িতে। সেই বর্ষামুখররাত, সেই নৈঃশব্দ্য, মাঝে মাঝে ফ্ল্যাশব্যাকে ফেরা মধুর মুহূর্ত—সব মিলিয়ে ছবির আবহ তৈরি হয় প্রায় কবিতার মতো।
চিত্রনাট্যকার অর্জুন দত্ত, আশীর্বাদ মৈত্র এবং সংলাপকার দলের সংবেদনশীল লেখনী ছবিকে করে গভীর। ডিওপি সুপ্রতিম ভোলের সিনেমাটোগ্রাফি লিরিকাল, বৃষ্টিকে যেন তৃতীয় চরিত্রে পরিণত করেছে—একঘেয়ে, দমবন্ধকর, তবু অনিবার্য। সুজয় দত্ত রায়ের সম্পাদনা পুরো ছবিকে ধরে রেখেছে সুশৃঙ্খল ছন্দে।
গ্রে শেডের চরিত্র—না সাদা, না কালো
ছবির শক্তি এখানেই—কারও পক্ষ নেয় না, কাউকে খলনায়কও বানায় না। স্বর্ণাভের ভুল কি শুধুই ভুল, নাকি জীবনে জড়িয়ে পড়া নতুন বাস্তব? মিলির আহত মন কি শুধু যন্ত্রণা, নাকি আত্মরক্ষার প্রাচীর? দু’জনই পরিণত, তাই কখনও মাত্রা হারায় না। তাদের রাগ, ভালোবাসা, নিরাপত্তাহীনতা—সবটাই বাস্তব।
এই জায়গায় ছবিটিকে মনে করিয়ে দেয় ‘ইজাজত’-এর আবেগ। কিন্তু ‘ডিপ ফ্রিজ’ একান্তই বাঙালি সময় ও মনস্তত্ত্বের গল্প—যেখানে ভাঙন শেষ নয়, কখনও কখনও নতুন শুরুর রাস্তাও।
অভিনয়: ছবির মেরুদণ্ড
আবির চট্টোপাধ্যায় স্বর্ণাভর অসহায়তা, অনুতাপ এবং ভালোবাসাকে দারুণ বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন।
তনুশ্রী চক্রবর্তী মিলির চরিত্রে সাবলীল, সংযত অভিনয় করেছেন।
অনুরাধা মুখোপাধ্যায় রঞ্জার ভূমিকায় চমকপ্রদ।
শিশুশিল্পী শোয়েব কবীরের সংলাপ বিশেষভাবে মনে রাখার মতো।
দেবযানী ও কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ও সংক্ষিপ্ত ভূমিকায় যথাযথ।
সৌম্য ঋতের মিউজিক ছবির আবহের সঙ্গে মিশে গেছে। ‘আমরা দু’জন ঘর ভেঙেছি কোন সুখে’—গানটি বিশেষ করে হৃদয়ে রয়ে যায়।
খুঁত যদি থাকে
কাহিনির কিছু অংশ—বিশেষত সন্তানের অসুস্থতা ও কফি খাওয়ার পুনরাবৃত্ত দৃশ্য—একঘেয়ে মনে হতে পারে। গল্পের শেষটা খানিকটা প্রেডিক্টেবলও। তবুও ছবির আবেগ, নির্মাণ এবং মানবিকতা এই ছোট ত্রুটিগুলোকে ছাপিয়ে যায়।
শেষ কথা
জাতীয় পুরস্কার পাওয়া ‘ডিপ ফ্রিজ’ শুধু ভাঙনের গল্প নয়—এটি সম্পর্কের নতুন অর্থ খোঁজার যাত্রা। দর্শকরা হলে গেলে হতাশ হবেন না। বরং বৃষ্টি ধুয়ে দেবে পুরোনো অভিমান, আর ছবির শেষে মনে ভাসবে প্রশ্ন—বরফ গললে কি সত্যিই সম্পর্ক আগের মতো থাকে? নাকি সে তৈরি করে নতুন এক বাস্তব?
আরও পড়ুন
পোস্টার মুক্তির দিনেই প্রয়াত ধর্মেন্দ্র: ‘ইক্কিস’ হতে চলেছে হি-ম্যানের শেষ উপহার