গত কয়েক মাসে সোনার দামে যে হারে বৃদ্ধি হয়েছে, তা নজিরবিহীন। প্রায় প্রতিদিনই নতুন রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলছে হলুদ ধাতু। ২০২৫ সালেই প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে সোনার দাম, যা সাধারণ বাজারচক্রের তুলনায় অনেকটাই অস্বাভাবিক। ফলে যাঁরা এই চড়া দামেও সোনা কিনছেন, তাঁদের মধ্যে আনন্দের বদলে বাড়ছে উদ্বেগ। প্রশ্ন উঠছে—এই দাম কি প্রকৃত চাহিদার ফল, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা এক ‘বুদবুদ’?

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সোনার বাজারে এখন বুদবুদের লক্ষণ স্পষ্ট। অতীতেও এমন ঘটেছে—দাম হঠাৎ আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে, তারপর বড় পতন এসেছে। ১৯৮০ সালে সোনার দাম সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছনোর পর প্রায় ৫৭ শতাংশ পড়ে গিয়েছিল, সেই স্তরে ফিরতে সময় লেগেছিল প্রায় ২৫ বছর। আবার ২০১১ সালের রেকর্ড বৃদ্ধির পর প্রায় ৪৫ শতাংশ সংশোধন হয়, যা কাটিয়ে উঠতে চার বছর সময় লাগে।
এবারও তেমন আশঙ্কাই করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বড় বড় বিদেশি ব্যাঙ্ক ও গবেষণা সংস্থার রিপোর্ট সোনার দামের উপর বড় প্রভাব ফেলছে। অভিযোগ, যখন দাম শীর্ষে থাকে, তখন গোল্ডম্যান স্যাক্স বা জেপি মরগানের মতো সংস্থাগুলি ইতিবাচক পূর্বাভাস প্রকাশ করে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সেই রিপোর্টে ভরসা করে উচ্চ দামে সোনা কেনেন। অন্যদিকে বড় বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে নিজেদের সোনা বিক্রি করে লাভ তুলে নেন।
এই প্রেক্ষিতেই উঠে আসছে ‘স্পুফিং’ কৌশলের কথা। এটি এমন এক পদ্ধতি, যেখানে প্রকৃত কেনার উদ্দেশ্য ছাড়াই বিপুল পরিমাণ ভুয়ো অর্ডার দেওয়া হয়। এতে কৃত্রিমভাবে চাহিদা বেড়ে যায় এবং দাম বাড়ে। পরে সেই অর্ডার বাতিল করা হয়। অতীতে এই কৌশল ব্যবহারের অভিযোগে জে.পি. মরগান ব্যাঙ্ককে প্রায় ৯২০ মিলিয়ন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭৬০০ কোটি টাকা) জরিমানা গুনতে হয়েছিল।
এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদি শেয়ার বাজারে বড় ধস নামে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা নগদের প্রয়োজনে সোনা ও রূপার ETF বিক্রি শুরু করবেন। এর ফলেই ২০২৬ সালে সোনা-রূপোর দামে বড়সড় সংশোধন বা পতন দেখা যেতে পারে।
এর পাশাপাশি খুচরো বাজারের ছবিটাও উদ্বেগজনক। বিয়ের মরশুম চললেও সোনা কেনাবেচা অনেকটাই কমেছে। চড়া দামের কারণে সোনা এখন গরিব মানুষের নাগালের বাইরে, দ্রুত মধ্যবিত্তের হাতছাড়াও হয়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তখন তা বাজারের জন্য বিপদ সংকেত। চাহিদা কমলে দাম পড়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান সোনার দামে বিনিয়োগের আগে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। অতীতের মতো এবারও কি বুদবুদ ফেটে বড় পতন আসবে—সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে হয়তো ২০২৬ সালেই।