বয়স বাড়লেও চেহারায় তার ছাপ কম দেখানোর চেষ্টা নতুন কিছু নয়। আগে যেখানে ফেশিয়াল, কসমেটিক ট্রিটমেন্ট বা বোটক্স ছিল জনপ্রিয়, এখন সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর নানা চিকিৎসা দ্রুত আলোচনায় আসছে। সেই তালিকায় নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি (HBOT)। বিদেশে বহু ধনী ব্যক্তি এবং তারকারা এই থেরাপি নেওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলার পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ভারতের বড় শহরগুলোর পাশাপাশি এখন কলকাতাতেও এই চিকিৎসা শুরু হয়েছে।
তবে প্রশ্ন একটি থেকেই যাচ্ছে—এটি কি সত্যিই যৌবন ধরে রাখার উপায়, নাকি নির্দিষ্ট কিছু রোগের চিকিৎসায় সীমিতভাবে কার্যকর?
হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি কী?

হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি মূলত একটি নন-ইনভেসিভ চিকিৎসা পদ্ধতি, অর্থাৎ এতে অস্ত্রোপচার বা কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না। এই পদ্ধতিতে রোগীকে একটি বিশেষভাবে তৈরি করা বদ্ধ চেম্বারের মধ্যে রাখা হয়। সেই চেম্বারে স্বাভাবিক বায়ুচাপের তুলনায় অনেক বেশি চাপে বিশুদ্ধ অক্সিজেন দেওয়া হয়।
সাধারণ অবস্থায় আমাদের শরীর ফুসফুসের মাধ্যমে যে পরিমাণ অক্সিজেন গ্রহণ করে, এই চিকিৎসায় তার তুলনায় অনেক বেশি অক্সিজেন রক্তের প্লাজমায় মিশে যায়। ফলে শরীরের নানা কোষে অক্সিজেনের সরবরাহ বেড়ে যায়। বিশেষ করে যেখানে রক্তসঞ্চালন কম, সেখানে এই অতিরিক্ত অক্সিজেন পৌঁছে কোষকে সক্রিয় করতে সাহায্য করতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
এই কারণেই অনেকে মনে করেন, শরীরের শক্তি বাড়ানো থেকে শুরু করে ক্ষত নিরাময়—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর উপকার মিলতে পারে।
অ্যান্টি-এজিং হিসেবে কেন আলোচনায়?
ইজরায়েলের এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল, নির্দিষ্ট সময় ধরে এই থেরাপি নিলে শরীরের জৈবিক বয়সের গতি কিছুটা কমতে পারে। গবেষণায় বলা হয়, কোষের গঠন ও কার্যকারিতার সঙ্গে যুক্ত কিছু পরিবর্তন এতে প্রভাবিত হতে পারে।
এই গবেষণা প্রকাশের পরই বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ব্রায়ান জনসনসহ বেশ কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তি নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এরপর অনেক তারকা ও ক্রীড়াবিদও ফিটনেস বা দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য এই থেরাপি নেওয়ার কথা জানান। ফলে বিষয়টি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, জনপ্রিয়তা বাড়লেও এটিকে এখনই ‘যৌবন ফেরানোর চিকিৎসা’ বলা ঠিক হবে না।
শতাব্দী পুরনো ধারণা, নতুন প্রয়োগ
এই চিকিৎসার ধারণা কিন্তু নতুন নয়। বহু শতাব্দী আগে সমুদ্রযাত্রা বা গভীর সমুদ্রে কাজ করা ডুবুরিদের শরীরে নানা জটিল সমস্যা দেখা দিত। তখন বায়ুচাপ নিয়ন্ত্রণ করে তাদের চিকিৎসার চেষ্টা শুরু হয়।
পরবর্তীতে ইউরোপে উচ্চচাপযুক্ত কক্ষ তৈরি করে ফুসফুসের রোগসহ নানা অসুখের চিকিৎসা করা হত। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি উন্নত হওয়ায় আজকের আধুনিক হাইপারবারিক চেম্বারের জন্ম হয়েছে।
বর্তমানে নৌবাহিনী, ডুবুরি চিকিৎসা এবং কিছু জটিল শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রে এই থেরাপি ব্যবহৃত হয়।
কলকাতাতেও শুরু এই চিকিৎসা
ভারতের দিল্লি ও মুম্বইয়ে আগে থেকেই এই থেরাপি চালু ছিল। এখন কলকাতাতেও কিছু হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত ক্লিনিকে এই পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, এই থেরাপি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, যেমন—
ডায়াবেটিক ফুট আলসার
ক্ষত দ্রুত সারানো
রেডিয়েশন থেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানো
স্ট্রোকের পরে পুনর্বাসন
কিছু কানে শোনার সমস্যায়
খেলাধুলায় আঘাতের পর সুস্থ হওয়া
কিছু ক্লিনিক দাবি করছে, জীবনধারাজনিত রোগ বা মানসিক সমস্যাতেও উপকার পাওয়া যেতে পারে। তবে এই দাবির সবটাই এখনও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
এক একটি সেশনের খরচ সাধারণত কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে এবং রোগভেদে একাধিক সেশন নেওয়ার প্রয়োজন হয়।
বিজ্ঞানীদের মতভেদ
চিকিৎসা মহলে এই থেরাপি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেক চিকিৎসক বলছেন, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এর উপকার প্রমাণিত। বিশেষ করে ক্ষত নিরাময় বা কিছু জটিল চিকিৎসার পরে পুনরুদ্ধারে এটি সহায়ক হতে পারে।
তবে অ্যালঝাইমার্স, অটিজম বা বার্ধক্য কমানোর মতো দাবিগুলিকে অনেক বিশেষজ্ঞ এখনই গ্রহণ করতে রাজি নন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল অক্সিজেনের অতিরিক্ত মাত্রা। বিজ্ঞানীদের মতে, শরীরে অতিরিক্ত অক্সিজেন কখনও কখনও ফ্রি র্যাডিক্যাল তৈরি করে ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই থেরাপি নেওয়া উচিত নয়।
টেলোমিয়ার ও বয়সের রহস্য
এই থেরাপিকে ঘিরে যে আলোচনা সবচেয়ে বেশি হয়েছে, তা হলো টেলোমিয়ার নামের একটি জৈবিক বিষয় নিয়ে। মানবদেহের কোষে থাকা ক্রোমোজোমের শেষ প্রান্তে টেলোমিয়ার থাকে, যা কোষ বিভাজনের সময় ডিএনএকে সুরক্ষা দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অংশ ছোট হতে থাকে, এবং সেটাকেই বার্ধক্যের একটি কারণ হিসেবে ধরা হয়।
কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি টেলোমিয়ারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই বিষয়ে এখনও আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বাস্তবতা ও প্রত্যাশার মাঝখানে
সব মিলিয়ে বলা যায়, হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি একেবারে নতুন নয়, কিন্তু নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে এর উপকার প্রমাণিত হলেও, এটিকে ‘যৌবন ফিরিয়ে দেওয়ার ম্যাজিক থেরাপি’ বলা এখনই বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
ভবিষ্যতে আরও গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল সামনে এলে এই চিকিৎসার প্রকৃত গুরুত্ব আরও পরিষ্কার হবে। আপাতত বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী এবং প্রয়োজন বুঝে এই থেরাপি নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.