ভারতে সামাজিক বৈষম্য দূর করতে তপসিলি জাতি, উপজাতি ও ওবিসি সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষণ ছিল বহু বছরের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। সংবিধান প্রণেতারা বিশ্বাস করতেন—যে সমাজের একটি বড় অংশ শতাব্দীর পর শতাব্দী শিক্ষার সুযোগ, সামাজিক মর্যাদা এবং আর্থিক উন্নতি থেকে বঞ্চিত থেকেছে, তাদের উন্নয়নে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া জরুরি। এই নীতির ফলেই বহু প্রান্তিক পরিবারের সন্তান উচ্চশিক্ষা, প্রশাসনিক চাকরি ও পেশাগত ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন।
তবে বর্তমান সময়ে সংরক্ষণ—বিশেষ করে SC, ST এবং OBC কোটা—নিয়ে বিতর্ক নতুন মোড় নিচ্ছে। দেশের দ্বিতীয় দলিত প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাই ইঙ্গিত দিয়েছেন, এখনই সময় সংরক্ষণ ব্যবস্থায় সংস্কারের।
“তেল মাখা মাথায় আবার তেল কেন?”—প্রধান বিচারপতির কটাক্ষ
একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বিচারপতি গাভাই স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সংরক্ষণের সুবিধা যারা ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত—তাদের সন্তানরা বারবার পেলে প্রকৃত দরিদ্র তপসিলি পরিবারগুলি প্রতিযোগিতায় আরও পিছিয়ে পড়ছে।
তিনি মন্তব্য করেছেন—
“একজন IAS অফিসারের ছেলে এবং একজন প্রান্তিক কৃষকের ছেলের সুযোগ কখনও সমান হতে পারে না। জন্মসূত্রে একই ক্যাটাগরিতে থাকলেও সুবিধার বণ্টন ন্যায্য হচ্ছে না।”
সংক্ষেপে, তিনি জানিয়েছেন—যারা অবস্থাপন্ন, তাদের জন্য সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই। সংরক্ষণ যেন জন্মসূত্রের অধিকার না হয়ে প্রকৃত প্রয়োজনভিত্তিক হয়।
সংরক্ষণের ইতিহাস ও বিতর্ক
ভারতে দলিত ও উপজাতিদের ওপর দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈষম্যের কারণে তাঁদের উন্নয়নের জন্যই সংবিধান সংরক্ষণের অধিকার প্রদান করে। উদ্দেশ্য ছিল—শিক্ষা, চাকরি এবং সামাজিক নিরাপত্তায় তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি।
কিন্তু ক্রমে অভিযোগ উঠতে শুরু করে—এই সুবিধা প্রকৃত প্রান্তিক মানুষদের হাতে পুরোপুরি পৌঁছাচ্ছে না। বরং সুবিধাভোগীদের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যেই আর্থিক ও সামাজিকভাবে স্থিতিশীল পরিবার থেকে আসছেন। ফলে প্রকৃত পিছিয়ে পড়াদের বরাদ্দ সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়: উপশ্রেণি বিভাজনের নতুন দিশা
২০২৪ সালের আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে—
রাজ্য সরকার চাইলে SC ও ST সম্প্রদায়ের মধ্যে উপশ্রেণি তৈরি করতে পারে, যাতে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অংশের জন্য আলাদা সংরক্ষণ নির্ধারিত হয়।
এই রায়ে প্রধান বিচারপতি গাভাই ছিলেন বেঞ্চের সদস্য। তাঁর মতে, এটি সংরক্ষণকে প্রকৃত সুবিধাভোগীর হাতে পৌঁছানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ।
তবে এখনও অনেক রাজ্য এই ব্যবস্থা কার্যকর করেনি। ফলে সংস্কারের বাস্তবায়ন পিছিয়ে আছে।
কেন দরকার ‘ক্রিমি লেয়ার’ বাদ দেওয়ার?
বিচারপতি গাভাই ও বহু সমাজবিজ্ঞানীর যুক্তি—
➡️ তপসিলি শ্রেণির অবস্থাপন্ন পরিবারগুলো আজ ভালো শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ পাচ্ছে।
➡️ প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে।
➡️ কিন্তু দারিদ্রসীমার নিচে থাকা অনগ্রসর দলিত পরিবারের সন্তানরা সেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
এই বৈষম্য দূর করতে SC–ST–OBC সংরক্ষণেও ক্রিমি লেয়ারের মতো ব্যবস্থা করার দাবি জোরদার হচ্ছে।
সংস্কার কি তাহলে অনিবার্য?
দেশের প্রধান বিচারপতির মন্তব্যে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে সংরক্ষণ নীতি। একদিকে সংরক্ষণ প্রান্তিক মানুষের জন্য অপরিহার্য—এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। অন্যদিকে অবস্থাপন্নদের সুবিধাপ্রাপ্তির ফলে প্রকৃত দরিদ্ররা পিছিয়ে পড়ছে—এই বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না।
আরও পড়ুন
কারা এড়াবেন মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ? জেনে নিন ঝুঁকি
তাই বিশেষজ্ঞদের মত—
সংরক্ষণ থাকবে, তবে বণ্টন হবে ন্যায্যতা ও প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে।
প্রধান বিচারপতি গাভাইয়ের বক্তব্য যেন সেই সংস্কারের সূচনা সঙ্কেত।

Hello, I am Biplab Baroi. I have been working in blogging for more than four years. I began my journey in the digital media industry in 2021.
Along with covering daily news and current events, I write articles on tech news, smartphones, and astrology. My work is created strictly for educational purposes use only.