মকর সংক্রান্তি নিয়ে প্রতি বছরই সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন দেখা দেয়—এই পবিত্র তিথি কি ১৪ জানুয়ারি, না কি ১৫ জানুয়ারি পালিত হবে? বাংলা ক্যালেন্ডার, ইংরেজি তারিখ এবং জ্যোতিষীয় গণনার পার্থক্যের কারণেই এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তবে জ্যোতিষশাস্ত্রের নিরিখে বিচার করলে ২০২৬ সালের মকর সংক্রান্তির প্রকৃত দিন ও সময় স্পষ্টভাবে নির্ধারিত।
জ্যোতিষশাস্ত্রে ‘সংক্রান্তি’ শব্দের অর্থ হল স্থানান্তর। সূর্য যখন একটি রাশি ত্যাগ করে পরবর্তী রাশিতে প্রবেশ করেন, সেই মুহূর্তকেই সংক্রান্তি বলা হয়। পৌষ মাসে সূর্য ধনু রাশিতে অবস্থান করেন এবং ধনু রাশি ছেড়ে মকর রাশিতে প্রবেশের দিনটিই পরিচিত হয় মকর সংক্রান্তি নামে। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে, ২০২৬ সালে সূর্য ধনু রাশি ত্যাগ করে মকর রাশিতে প্রবেশ করছেন ১৪ জানুয়ারি, বুধবার, ভারতীয় সময় বিকেল ৩টা ৭ মিনিটে। সেই কারণেই জ্যোতিষীয় বিচারে এবং বাংলার প্রথা অনুযায়ী ১৪ জানুয়ারিতেই মকর সংক্রান্তি পালিত হবে।
মকর সংক্রান্তির ধর্মীয় গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। শাস্ত্র মতে, এই পবিত্র তিথিতেই গঙ্গাদেবীর আবির্ভাব হয়েছিল। তাই এই দিনটি গঙ্গা-আবির্ভাব তিথি হিসেবেও পরিচিত। এই বিশ্বাস থেকেই প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী গঙ্গাসাগরে সমবেত হন। সাগরসঙ্গমে পুণ্যস্নান এবং কপিলমুনির আশ্রমে পুজো করলে বিশেষ পুণ্যলাভ হয় বলে মনে করা হয়। যাঁদের পক্ষে গঙ্গাসাগরে যাওয়া সম্ভব নয়, তাঁরা নিকটবর্তী গঙ্গা বা অন্য কোনও পবিত্র নদী, জলাশয় কিংবা ঘরে জল নিয়ে স্নান করলেও শাস্ত্রমতে সমান পুণ্য লাভ হয়।
পুণ্যস্নানের সময় নিয়েও শাস্ত্রে বিশেষ নির্দেশ রয়েছে। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী মকর সংক্রান্তির দিনে অমৃতযোগ ও মাহেন্দ্রযোগ তৈরি হচ্ছে। সূর্যোদয়ের আগে শুরু হওয়া এই শুভ যোগে স্নান, দান ও পুজোপাঠ করলে তার ফল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে সূর্যোদয় থেকে দুপুরের আগের সময়টিকে পুণ্যস্নানের জন্য সবচেয়ে শুভ বলে ধরা হয়। এই সময় স্নান করলে পাপক্ষয় হয় এবং জীবনে শুভ শক্তির প্রবাহ বৃদ্ধি পায়—এমনটাই বিশ্বাস।
মকর সংক্রান্তির আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল উত্তরায়ণ। এই দিন থেকেই সূর্যের উত্তর দিকে যাত্রা শুরু হয়। শাস্ত্র মতে উত্তরায়ণ দেবতাদের দিন এবং দক্ষিণায়ণ দেবতাদের রাত্রি। তাই উত্তরায়ণের সূচনাকে অত্যন্ত শুভ ধরা হয়। মহাভারতের ভীষ্ম পিতামহও উত্তরায়ণের অপেক্ষায় শরশয্যায় থেকে দেহত্যাগ করেছিলেন—এই কাহিনি মকর সংক্রান্তির মাহাত্ম্যকে আরও গভীর করে তোলে।
বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে মকর সংক্রান্তি মানেই পিঠে উৎসব। চালের গুঁড়ো, নারকেল এবং খেজুর গুড় দিয়ে তৈরি পুলি পিঠে, পাটিসাপটা, ভাপা পিঠে ছাড়া এই দিন যেন অসম্পূর্ণ। বহু পরিবারে এই দিনে লক্ষ্মীপুজো, বাস্তুপুজো ও টুসুপুজো করা হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলায় টুসুপুজো ফসলের দেবীর আরাধনার সঙ্গে যুক্ত, যা কৃষিজীবন ও প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রতীক।
আধুনিক জীবনেও মকর সংক্রান্তির গুরুত্ব কমেনি। এই উৎসব আমাদের শেখায় পরিবর্তনকে স্বাগত জানাতে, পুরনোকে পেছনে ফেলে নতুন সূর্যের আলোয় এগিয়ে যেতে। ধর্মীয় আচার, সামাজিক উৎসব এবং পারিবারিক মিলনের মধ্য দিয়ে মকর সংক্রান্তি আজও বাঙালির জীবনে আনন্দ ও পবিত্রতার এক অনন্য মিলনক্ষেত্র হয়ে রয়েছে।
সব মিলিয়ে, বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী ২০২৬ সালে মকর সংক্রান্তি পালিত হবে ১৪ জানুয়ারি। এই দিনই সূর্য মকর রাশিতে প্রবেশ করবেন এবং এই তিথিতেই পুণ্যস্নান, দান ও পুজোপাঠ করলে সর্বাধিক শুভ ফল লাভ করা যাবে।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.