গণতান্ত্রিক দেশে ভোটাধিকার একজন নাগরিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার। সাধারণত ১৮ বছর পূর্ণ হলেই একজন ভারতীয় নাগরিক প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু অভিনেতা রাজা চট্টোপাধ্যায়ের জীবনে এই সাধারণ ঘটনাই হয়ে উঠেছিল এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প। অবশেষে ৫৭ বছর বয়সে এসে তিনি জীবনের প্রথম ভোটটি দিতে সক্ষম হয়েছেন, যা তাঁর কাছে শুধুই ভোটদান নয়, বরং নিজের নাগরিক পরিচয় ফিরে পাওয়ার এক আবেগঘন মুহূর্ত।
রাজা চট্টোপাধ্যায়ের ভোটযাত্রার শুরুটা ছিল বহু বছর আগে, যখন তিনি প্রথমবার ভোটার তালিকায় নাম ওঠার পর প্রবল উৎসাহ নিয়ে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন। তরুণ বয়সের সেই প্রথম অভিজ্ঞতা কিন্তু সুখকর ছিল না। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বুথে পৌঁছে তিনি জানতে পারেন, তাঁর ভোট ইতিমধ্যেই কেউ দিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনাটি তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। প্রথম ভোটের স্বপ্ন সেদিনই ভেঙে যায় এবং ক্ষোভে-অভিমানে তিনি দীর্ঘদিন ভোট প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন।
বছর কয়েক পরে নাগরিক দায়িত্ববোধ থেকে আবারও ভোট দিতে আগ্রহী হন রাজা। কিন্তু দ্বিতীয়বারের অভিজ্ঞতা ছিল আরও বিস্ময়কর এবং হতাশাজনক। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, সরকারি নথিতে তাঁকে মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জীবিত থাকা সত্ত্বেও কাগজে-কলমে নিজের অস্তিত্ব হারানোর এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও নিরাশ করে তোলে। এরপর তিনি কার্যত ভোটদানের আশা ছেড়ে দেন।
সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলায়। উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণ কলকাতায় বাসস্থান পরিবর্তনের পর ২০২৬ সালে তাঁর নতুন ভোটার কার্ড তৈরি হয়। পরিচিতজন ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় এবার তিনি আবার ভোট দিতে এগিয়ে আসেন। ভোটের দিন বহু মানুষ তাঁকে সাহায্যের প্রস্তাব দেন। বিশেষ করে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর অসুবিধার কথা মাথায় রেখে অনেকে পাশে দাঁড়ান।
শেষ পর্যন্ত এক পরিচিত ছোট ভাইয়ের বাইকে করে তিনি ভোটকেন্দ্রে পৌঁছান। সেখানে কর্মীদের সহায়তায় অপেক্ষাকৃত সহজে তিনি বুথে প্রবেশের সুযোগ পান। বহু বছরের অপেক্ষার পর ইভিএমের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভোট নিজে দিতে পারা তাঁর কাছে ছিল এক অনন্য অনুভূতি।
রাজা চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, এই অভিজ্ঞতা শুধু ভোট দেওয়া নয়, বরং নিজের কণ্ঠস্বর ফিরে পাওয়ার মতো। ১৮ বছর বয়সের সেই প্রথম উত্তেজনা হয়তো আর নেই, কিন্তু ৫৭ বছর বয়সে এই ভোট তাঁর কাছে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ ৩৮ বছরের অপেক্ষার পর নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারার আনন্দ ও গর্ব তিনি স্পষ্টভাবে অনুভব করেছেন।
এই ঘটনাটি শুধুমাত্র একজন অভিনেতার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার কিছু ত্রুটি ও সাধারণ নাগরিকের লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবেও ধরা যেতে পারে। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয় যে ভোট কেবল একটি বোতাম টেপা নয়, এটি একজন নাগরিকের মতামত, অধিকার এবং অস্তিত্বের প্রতিফলন।
রাজা চট্টোপাধ্যায়ের এই দীর্ঘ যাত্রা অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠতে পারে— যত বাধাই আসুক, নিজের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা কখনও থেমে থাকা উচিত নয়।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.