একসময় গ্রামের উঠোনে, নদীর ধারে কিংবা খোলা মাঠে শুয়ে রাতের আকাশে তারা গোনার অভ্যাস ছিল বহু মানুষের। কালপুরুষ, সপ্তর্ষিমণ্ডল কিংবা শুকতারা খুঁজে বের করার আনন্দ ছিল শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতির অংশ। কিন্তু আধুনিক নগরজীবনের কৃত্রিম আলো, উঁচু ইমারত এবং দূষণের কারণে সেই আকাশ এখন আর সহজে দেখা যায় না। শহরের আকাশে তারারা যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘অ্যাস্ট্রো ট্যুরিজ়ম’ বা তারা দর্শনের ভ্রমণ। প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরা এখন এমন জায়গার খোঁজ করছেন, যেখানে রাত নামলেই আকাশ ভরে ওঠে অসংখ্য তারায়। শুধু তারা নয়, ভাগ্য ভাল থাকলে খালি চোখেই দেখা মিলতে পারে ছায়াপথেরও।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এমন বহু জায়গা রয়েছে, যেখানে আলোর দূষণ কম হওয়ায় রাতের আকাশ অত্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু পাহাড়ি গ্রাম ইতিমধ্যেই তারা দর্শনের জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছে। ঝাণ্ডি, রিশপ, সিটং, লামাহাটা, তিনচুলে কিংবা বক্সার মতো জায়গায় রাতের আকাশে অসংখ্য তারা স্পষ্ট দেখা যায়। সিঙ্গলিলা ন্যাশনাল পার্কের সন্দাকফু, টোাংলু, রিমবিক বা ধোত্রের মতো ট্রেকিং রুটেও পর্যটকেরা মুগ্ধ হন আকাশের অপূর্ব সৌন্দর্যে। কিছু জায়গা থেকে ছায়াপথও দেখা যায় বলে দাবি করেন পর্যটকেরা।

দক্ষিণবঙ্গেও কিছু প্রত্যন্ত এলাকা রয়েছে, যেখানে পরিষ্কার আবহাওয়ায় দারুণ তারা দেখা যায়। পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা বা গনগনির মতো গ্রামীণ অঞ্চল এবং পূর্ব মেদিনীপুরের তাজপুর ও মন্দারমণির সমুদ্রতট এই অভিজ্ঞতার জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বর্ষার পর বা দূষণ কম থাকলে এই সব জায়গার রাতের আকাশ অনেক বেশি স্বচ্ছ থাকে।
পশ্চিমবঙ্গের বাইরে ওড়িশার ডেবরিগড় এখন অ্যাস্ট্রো ট্যুরিজ়মের অন্যতম আকর্ষণ। সেখানে পর্যটকদের জন্য বিশেষ ‘স্টার গেজ়িং’ ব্যবস্থাও রয়েছে। টেলিস্কোপ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন দূরবিনের সাহায্যে পর্যটকেরা বিভিন্ন গ্রহ ও নক্ষত্রপুঞ্জ দেখতে পারেন। হিরাকুঁদ ও ভিতরকণিকার কিছু অঞ্চলও একই কারণে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
অন্যদিকে লাদাখের প্যাংগং লেক, নুব্রা উপত্যকা কিংবা হানলের মতো অঞ্চল রাতের আকাশ দেখার জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছে। পাহাড়ে ঘেরা বিস্তীর্ণ অন্ধকার আকাশে অসংখ্য তারা এমনভাবে জ্বলজ্বল করে যে, মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই বিশাল এক তারামঞ্চ তৈরি করেছে।
হিমাচল প্রদেশের স্পিতি উপত্যকাও অ্যাস্ট্রো-ফোটোগ্রাফারদের কাছে স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার আকাশ অত্যন্ত স্বচ্ছ। কিব্বর বা ল্যাংজার মতো গ্রাম থেকে খালি চোখেই ছায়াপথের স্পষ্ট রেখা দেখা যায়।
গুজরাটের কচ্ছের রান কিংবা রাজস্থানের জৈসলমেরেও মরুভূমির খোলা আকাশ পর্যটকদের অন্যরকম অভিজ্ঞতা দেয়। রাতের নীরবতা, বিস্তীর্ণ দিগন্ত আর অসংখ্য তারা মিলিয়ে তৈরি হয় এক স্বপ্নময় পরিবেশ।
উত্তরাখণ্ডের বেনিতালকে ভারতের প্রথম ‘অ্যাস্ট্রো ভিলেজ’ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। সেখানে বিশেষ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রও তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে আন্দামানের নীল আইল্যান্ড কিংবা কর্নাটকের কুর্গেও পর্যটকদের জন্য তারা দেখার বিশেষ আয়োজন রাখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাস্ট্রো ট্যুরিজ়ম শুধু বিনোদন নয়, প্রকৃতি ও মহাকাশ সম্পর্কে মানুষের কৌতূহলও বাড়িয়ে তোলে। ব্যস্ত নগরজীবন থেকে দূরে গিয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই এখন মানসিক প্রশান্তির এক নতুন ঠিকানা হয়ে উঠেছে।
Sumi has been waiting lifestyle, vastu Tips since 2026.