বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবদন্তির মর্যাদা পায়। তাঁদের অন্যতম ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাঁর প্রয়াণের পর এক দশকেরও বেশি সময় কেটে গেলেও বাংলা সিনেমাপ্রেমীদের কাছে ৩০ মে এখনও গভীর বেদনার দিন। কারণ এই দিনেই অকস্মাৎ হারিয়ে গিয়েছিলেন এমন এক নির্মাতা, যিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে নতুন ভাষা, নতুন ভাবনা এবং নতুন সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
পরিচালকের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করে আবেগঘন বার্তা শেয়ার করেছেন অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁদের সম্পর্ক শুধুমাত্র পরিচালক ও অভিনেত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্যক্তিগত জীবনেও ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন অভিনেত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন মানুষ। ঋতুপর্ণার কথায়, তিনি ছিলেন এমন একজন পথপ্রদর্শক, যার পরামর্শ ও সান্নিধ্য জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে।
অভিনেত্রী স্মরণ করেছেন নিজের বিয়ের দিনের একটি বিশেষ ঘটনা। জানা যায়, তাঁর বিয়ের আমন্ত্রণপত্রের ভাষা রচনায়ও যুক্ত ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। শুধু তাই নয়, বিয়ের সাজের ক্ষেত্রেও তিনি বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। কনের পোশাকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজের হাতে চন্দনের নকশা এঁকে দিয়েছিলেন অভিনেত্রীর কপালে। সেই স্মৃতিকে আজও জীবনের অন্যতম মূল্যবান মুহূর্ত হিসেবে মনে করেন ঋতুপর্ণা।
আবার জীবনের একেবারে বিপরীত প্রান্তের একটি স্মৃতিও তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে রয়েছে। ২০১৩ সালের ৩০ মে, যখন ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যুসংবাদ গোটা শিল্পমহলকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল, তখন শেষ বিদায়ের মুহূর্তেও তাঁর পাশে ছিলেন ঋতুপর্ণা। প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো সম্মানের সঙ্গে সাজিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও তিনি পালন করেছিলেন। সেই দিনের স্মৃতি এখনও অভিনেত্রীকে আবেগাপ্লুত করে।
মৃত্যুবার্ষিকীতে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা বার্তায় ঋতুপর্ণা জানিয়েছেন, সময় যতই পেরিয়ে যাক না কেন, ঋতুপর্ণ ঘোষের সৃষ্টিশীলতা, চিন্তাভাবনা এবং শিল্পভাবনা এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর নির্মিত কাজ আজও দর্শক ও শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জোগায়। অভিনেত্রীর মতে, একজন শিল্পী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবেও ঋতুপর্ণ ঘোষ অসংখ্য স্মৃতি ও মূল্যবোধ রেখে গিয়েছেন, যা এখনও তাঁদের জীবনের অংশ হয়ে আছে।

বাংলা সিনেমায় তাঁদের যৌথ কাজও বিশেষভাবে স্মরণীয়। দহন এবং উৎসব-এর মতো ছবিতে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি কাজের পরিকল্পনা থাকলেও সেগুলি বাস্তব রূপ পায়নি। পরিচালকের অকালপ্রয়াণের কারণে অসম্পূর্ণ থেকে যায় একাধিক সৃজনশীল পরিকল্পনা, যার আক্ষেপ অভিনেত্রী বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ করেছেন।
ঋতুপর্ণ ঘোষকে স্মরণ করেছেন অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়-ও। দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও বন্ধুকে স্মরণ করে তিনি জানিয়েছেন, আজও তাঁর মনে হয় যেন হঠাৎ ফোন করে নতুন কোনও গল্প শোনাতে ডাকবেন ঋতুপর্ণ। এই অনুভূতির মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে পরিচালকের অনুপস্থিতি কতটা গভীরভাবে অনুভব করেন তাঁর সহকর্মীরা।
তেরো বছর পরেও ঋতুপর্ণ ঘোষ শুধুমাত্র একজন পরিচালক নন, বাংলা সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র, সম্পর্কের প্রতি তাঁর সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিল্পচিন্তা আজও নতুন প্রজন্মকে আলো দেখায়। তাই ক্যালেন্ডারে ৩০ মে এলেই তাঁকে ঘিরে ফিরে আসে স্মৃতি, আবেগ এবং এক অপূরণীয় শূন্যতার অনুভব।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than five years.