রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু বাংলা ভাষা বা বাঙালি সংস্কৃতির গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নন— এই বিশ্বাস থেকেই এক শিল্পী দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে নতুন ভাবে তুলে ধরার কাজ করে চলেছেন। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথের গান এমন এক মানবিক ভাষা, যা পৃথিবীর নানা দেশের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে দিতে পারে।
বর্তমানে নিউ ইয়র্কে বসবাসকারী এই শিল্পী কর্মসূত্রে নিয়মিত জার্মানিতে যাতায়াত করেন। সেখানে বিভিন্ন অর্কেস্ট্রা ও ধ্রুপদী বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন, পাশ্চাত্য সঙ্গীতচর্চার ধরণ ভারতীয় পদ্ধতির থেকে অনেকটাই আলাদা। বিদেশি শিল্পীরা সাধারণত লিখিত স্বরলিপি ও নির্দিষ্ট ব্যাকরণ অনুসরণ করে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। অন্যদিকে ভারতীয় সঙ্গীতে শ্রুতি ও অনুভবের ভূমিকা অনেক বেশি।
এই ভিন্নতার মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন নতুন সম্ভাবনা। তাঁর মতে, রবীন্দ্রসঙ্গীত শুধু সুরের সমষ্টি নয়; এর মূল শক্তি লুকিয়ে রয়েছে গানের কাব্য, দর্শন ও অনুভূতিতে। তাই বিদেশি শিল্পীদের কাছে শুধু সুর শেখানো নয়, রবীন্দ্রনাথের ভাবনা ও মানবিকতার দিকটিও ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় তিনি নিজেই গানগুলির ইংরেজি বা অন্য ভাষায় অনুবাদ করে শিল্পীদের বোঝান, যাতে গানের অন্তর্নিহিত আবেগ অক্ষুণ্ণ থাকে।
জার্মানির বিভিন্ন অর্কেস্ট্রার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, ভিন্ন সংস্কৃতির শিল্পীরাও রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির গভীরতা অনুধাবন করতে সক্ষম। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে ফ্ল্যামেঙ্কো গিটারের সংযোজন হয়েছিল। আবার অন্য একটি পরিবেশনায় বাংলা গানের সঙ্গে ইউক্রেনীয় স্যাক্সোফোনবাদকের অংশগ্রহণও দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। বিভিন্ন দেশের শিল্পীরা নিজেদের যন্ত্রের মাধ্যমে রবীন্দ্রসঙ্গীতের আবেগকে প্রকাশ করেছেন, অথচ গানের মূল বক্তব্যের কোনও বিকৃতি ঘটেনি।
শিল্পীর মতে, এই অভিজ্ঞতাগুলি প্রমাণ করে যে ভাষা বা সংস্কৃতি কখনও শিল্পের অন্তরায় হতে পারে না। বরং সঠিক উপস্থাপনা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে এক সংস্কৃতির শিল্প অন্য সংস্কৃতির মানুষের হৃদয়েও গভীরভাবে পৌঁছে যেতে পারে। তিনি মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ নিজেও আধুনিক ও উদার মানসিকতার মানুষ ছিলেন। তাই সঙ্গীতের মূল ভাব বজায় রেখে নতুন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে তিনি নিশ্চয়ই সমর্থন করতেন।
বিদেশের মঞ্চে তিনি কখনও সম্পূর্ণ ঐতিহ্যবাহী উপায়ে তবলা, খোল, বাঁশি ও এসরাজের সঙ্গতে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। আবার কখনও পশ্চিমী অর্কেস্ট্রার সঙ্গে ভারতীয় সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই শ্রোতাদের জন্য গানের অনুবাদ রাখা হয়, যাতে তারা গানের ভাব সহজে উপলব্ধি করতে পারেন। তাঁর অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ভিন্ন ভাষার শ্রোতারাও অনেক সময় গানের আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন।
বর্তমানে তিনি জার্মানিতে একটি আন্তর্জাতিক সঙ্গীত উৎসব আয়োজনের কাজ করছেন, যার মূল বার্তা— সঙ্গীত সব ধরনের বিভাজনের ঊর্ধ্বে। তাঁর মতে, বর্তমান পৃথিবীতে যুদ্ধ, বিভাজন, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংঘাত ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে শিল্প ও সঙ্গীত মানুষের মধ্যে সংযোগ গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের গান সেই মানবিকতার কথাই বলে।
আগামী দিনে তিনি আরও বৃহত্তর আন্তর্জাতিক মঞ্চে রবীন্দ্রসঙ্গীত তুলে ধরতে চান। ভেনিস বিয়েনেলের মতো আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে ভারতীয় ও পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনের পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। তাঁর বিশ্বাস, যত বেশি মানুষের কাছে রবীন্দ্রনাথের গান পৌঁছবে, তত বেশি মানুষ তাঁর উদার ও মানবিক দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হবেন।
তিনি মনে করেন, রবীন্দ্রনাথকে শুধুমাত্র “বাঙালির কবি” হিসেবে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তাঁর বিশ্বজনীনতা ছোট হয়ে যায়। সাহিত্য, সঙ্গীত, মানবতাবাদ ও চিন্তাধারায় তাঁর অবদান আন্তর্জাতিক। তাই বিশ্বদরবারে রবীন্দ্রনাথকে তুলে ধরা মানে শুধু বাংলা সংস্কৃতির প্রচার নয়, বরং মানবিকতার এক বৃহত্তর বার্তা পৌঁছে দেওয়া।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.