পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision) ঘিরে মাত্র এক মাসে ৩৩টি মৃত্যু ঘটেছে বলে রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন শুরু হয়েছে। ২৮ অক্টোবর থেকে ২৮ নভেম্বর—এই ৩১ দিনের মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন ১৮ জন, এবং হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকে মারা গিয়েছেন আরও ১৫ জন। অভিযোগ উঠেছে, ভোটার তালিকায় নাম থাকবে কি না, সেই ভয় এবং কাজের অতিরিক্ত চাপই এই মৃত্যুর নেপথ্যে।
❗ প্রথম দিনেই প্রথম আত্মহত্যা
এসআইআর চালুর প্রথম দিন—২৮ অক্টোবর—উত্তর ২৪ পরগনার খড়দহের বাসিন্দা প্রদীপ কর আত্মহত্যা করেন। এর পর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটেছে মুর্শিদাবাদে, মোট ৯ জন। দুই মেদিনীপুর, দুই ২৪ পরগনা, হুগলি, জলপাইগুড়ি, দুই দিনাজপুর এবং হাওড়া থেকেও মৃত্যুর খবর মিলেছে।
এর মধ্যে দুইজন বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও)। তাঁদের পরিবার দাবি করছে, অত্যধিক কাজের চাপ এবং দ্রুত সময়সীমায় এসআইআরের কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা তাঁদের মানসিকভাবে চূড়ান্ত চাপে ফেলে দেয়।
🧮 আত্মহত্যার পরিসংখ্যান কী বলছে?
জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো (NCRB)-র ২০২২ ও ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী:
* পশ্চিমবঙ্গে বছরে আত্মহত্যার গড় ১২,০০০-এর বেশি
* দিনে প্রায় ৩৫ জন আত্মহত্যা করেন
* আত্মহত্যার প্রধান কারণ পারিবারিক সমস্যা
* কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা সরকারি হিসেবে শূন্য
* কর্মক্ষেত্রের চাপ বা চাকরি হারানোর ভয়ে আত্মহত্যা: ১.১%
* দেশে ২০২৩ সালে মোট আত্মহত্যা ১,৭০,৮৯৬, যার মধ্যে পুরুষ ১,২২,৭২৪, মহিলা ৪৮,১৭২
এই বৃহত্তর জাতীয় চিত্রের তুলনায় এসআইআর-সম্পর্কিত আতঙ্কে আত্মহত্যা বা চাপজনিত মৃত্যু অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন, বলছেন পর্যবেক্ষকেরা।
🗳️ অন্যান্য ১১ রাজ্যেও এসআইআর
পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও দেশের আরও ১১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে একই সময়ে শুরু হয়েছে এসআইআরের কাজ। অন্যান্য রাজ্যেও কিছু বিএলও-র মৃত্যুর খবর মিললেও সাধারণ ভোটারের আতঙ্কে আত্মহত্যার নজির এখনও পর্যন্ত শুধু বাংলাতেই।
⚔️ রাজনীতি তুঙ্গে: দায় কার?
তৃণমূল কংগ্রেস প্রকাশ্যে দাবি করেছে,
“এসআইআরের আতঙ্ক এবং কাজের চাপই এই মৃত্যুর জন্য দায়ী।”
দলটির শীর্ষ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন যে,
দিল্লিতে এসআইআর বিরোধী আন্দোলনে নামবে তৃণমূল।
দশ সাংসদ-সহ একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকও করেছে। তাদের অভিযোগ:
কমিশন কোনও প্রশ্নের যথাযথ জবাব দেয়নি
মৃত্যুর দায় কমিশন নেবে কি না, তারও উত্তর মেলেনি
🏛️ মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০ নভেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি লিখে রাজ্যের পরিস্থিতির কথা জানিয়ে এসআইআর স্থগিতের দাবি তোলেন। তাঁর অভিযোগ—
* বিএলওরা অস্বাভাবিক কাজের চাপে পড়ছেন
* প্রশাসনিক প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়
* মৃত্যুর ঘটনা স্পষ্টভাবে কাজের চাপ-সংশ্লিষ্ট
🏢 কমিশনের বক্তব্য
নির্বাচন কমিশনের পাল্টা যুক্তি:
*পশ্চিমবঙ্গের ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ৮২.৯১%-এর গণনাপত্র ইতিমধ্যেই ডিজিটাইজড
* ৪ ডিসেম্বর সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি
* বিহারে একই প্রক্রিয়া এক মাসে সম্পন্ন হয়েছে, সেখানে এমন আত্মহত্যা হয়নি
* আসলেই কতজনের মৃত্যু এসআইআরচাপজনিত—তা রাজ্যের রিপোর্ট দেখে চূড়ান্তভাবে বিচার করা হবে
🧨 কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও প্রতিক্রিয়া
কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, ১২ রাজ্যে ২৬ জন বিএলও মারা গেছেন, এবং এর দায় প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাচন কমিশনের।
🔍 নজিরবিহীন পরিস্থিতি
নাগরিকত্ব হারানো বা ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কায় আত্মহত্যার ঘটনা এর আগে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়নি। প্রশাসনিক নির্দেশিত কাজ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের এই ধরনের মৃত্যুও বিরল।
এসআইআর প্রক্রিয়া এগোতে থাকায় প্রশ্ন উঠছে—
এত মৃত্যুর পরও কি প্রক্রিয়া বন্ধ হবে, নাকি রাজনৈতিক চাপ-তর্কের মধ্যেই চলবে ডিজিটাইজেশনের কাজ?
আগামী কয়েক সপ্তাহে কমিশন ও রাজ্যের অবস্থানই নির্ধারণ করবে রাজ্যের ভোট রাজনীতি ঠিক কোন পথে এগোবে।

Hello, I am Biplab Baroi. I have been working in blogging for more than four years. I began my journey in the digital media industry in 2021.
Along with covering daily news and current events, I write articles on tech news, smartphones, and astrology. My work is created strictly for educational purposes use only.