বর্তমানে অনেক তরুণ-তরুণী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। রিপোর্টে কোলেস্টেরল, সুগার, ট্রাইগ্লিসারাইড—সবই স্বাভাবিক থাকে। তবুও হঠাৎ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সব ঠিক থাকলেও সমস্যা কোথায়?
চিকিৎসকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে এর উত্তর লুকিয়ে থাকে এমন এক উপাদানে, যা সাধারণ পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। সেটি হল লিপোপ্রোটিন (a) বা Lp(a)। এই উপাদান সম্পর্কে সচেতনতা তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু হৃদ্রোগের ঝুঁকি নির্ধারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লিপোপ্রোটিন (a) কী এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ
আমরা সাধারণত হৃদ্স্বাস্থ্যের কথা বললে তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করি—
এইচডিএল (ভাল কোলেস্টেরল)
এলডিএল (খারাপ কোলেস্টেরল)
ট্রাইগ্লিসারাই

কিন্তু হৃদ্রোগের ঝুঁকি বোঝার জন্য এই তিনটি তথ্য সব সময় যথেষ্ট নয়। লিপোপ্রোটিন (a) এমন একটি ফ্যাট-প্রোটিন যৌগ, যা রক্তে থেকে ধীরে ধীরে ধমনীর ভেতরে জমে যেতে পারে। অনেক সময় এর মাত্রা বেশি থাকলে রক্তনালিতে সমস্যা তৈরি হয়, যদিও অন্য সব রিপোর্ট স্বাভাবিক দেখায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, Lp(a) বেশি থাকলে কম বয়সেও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জন্মগত কারণেই বাড়তে পারে এই ঝুঁকি
লিপোপ্রোটিন (a)-এর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল—এটি মূলত জিনগত। অর্থাৎ, একজন মানুষ জন্ম থেকেই এর একটি নির্দিষ্ট মাত্রা নিয়ে জন্মান। সাধারণ কোলেস্টেরলের মতো খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম বা ওজন কমানোর মাধ্যমে এটি খুব বেশি কমানো যায় না।
এই কারণেই অনেক স্বাস্থ্যসচেতন মানুষও অজান্তেই ঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারেন। তারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, সুষম খাবার খান, তবুও Lp(a) বেশি থাকলে হৃদ্রোগের সম্ভাবনা থেকে যায়।
‘নরমাল রিপোর্ট’ কেন কখনও বিভ্রান্তিকর হতে পারে
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এলডিএল বা মোট কোলেস্টেরল স্বাভাবিক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রক্তনালির ভেতরে চর্বির স্তর বা প্লাক তৈরি হচ্ছে। এর পিছনে লিপোপ্রোটিন (a) একটি বড় কারণ হতে পারে।
Lp(a) বেশি হলে সাধারণত যা ঘটে—
রক্তনালিতে দ্রুত ফ্যাট বা প্লাক জমতে সাহায্য করে
শরীরে প্রদাহের প্রবণতা বাড়ায়
ধমনীর দেয়ালে ক্ষতি দ্রুত হয়
রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ে
এর ফল হতে পারে খুবই গুরুতর—হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক, অনেক সময় কোনো আগাম লক্ষণ ছাড়াই।
ভারতীয়দের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি হওয়ার কারণ
চিকিৎসকরা মনে করেন, দক্ষিণ এশীয়দের শরীরে জিনগতভাবে হৃদ্রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তার সঙ্গে জীবনযাপনের কিছু সমস্যা যুক্ত হলে বিপদ আরও বাড়ে।
যেমন—
পেটের মেদ বা সেন্ট্রাল ওবেসিটি
ডায়াবেটিস
কম শারীরিক পরিশ্রম
অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস
অতিরিক্ত মানসিক চাপ
এই সব কারণের সঙ্গে যদি লিপোপ্রোটিন (a) মাত্রা বেশি থাকে, তাহলে কম বয়সেও হৃদ্রোগের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যেতে পারে।
কখন লিপোপ্রোটিন (a) পরীক্ষা করা প্রয়োজন
হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনে অন্তত একবার Lp(a) পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কৈশোর বা তরুণ বয়সেই এই পরীক্ষা করলে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
নিচের পরিস্থিতিতে দেরি না করে পরীক্ষা করা উচিত—
পরিবারে কম বয়সে হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস থাকলে
পরিবারের কারও হঠাৎ কার্ডিয়াক মৃত্যু হয়ে থাকলে
অল্প বয়সেই কোলেস্টেরল বেশি ধরা পড়লে
নিজের স্বাস্থ্য রিপোর্ট স্বাভাবিক হলেও ঝুঁকি নিয়ে সন্দেহ থাকলে
একটি পরীক্ষাই অনেক সময় ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
লিপোপ্রোটিন (a) বেশি হলে কী করবেন
এটি কমানো কঠিন হলেও, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসকেরা সাধারণত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মেনে চলার পরামর্শ দেন—
1. এলডিএল কোলেস্টেরল যতটা সম্ভব কম রাখা
2. নিয়মিত শরীরচর্চা করা
3. স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা
4. ধূমপান সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা
5. অ্যালকোহল গ্রহণ কমানো বা বন্ধ করা
6. প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ
মূল কথা হল, লিপোপ্রোটিন (a) পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও সঠিক জীবনযাপন ও চিকিৎসার মাধ্যমে এর প্রভাব অনেকটাই কমানো যায়।
সচেতনতা কেন জরুরি
অনেক সময় আমরা শুধু সাধারণ কোলেস্টেরল রিপোর্ট দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে যাই। কিন্তু হৃদ্স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বোঝার জন্য আরও কিছু সূচক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। লিপোপ্রোটিন (a) তার মধ্যে অন্যতম।
তাই চিকিৎসকদের মতে, নিজের এবং পরিবারের হৃদ্রোগের ইতিহাস জানা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে Lp(a) টেস্ট করানো—এই তিনটি বিষয় ভবিষ্যতে বড় বিপদ এড়াতে সাহায্য করতে পারে।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.