গরমকাল আর আম— এই দুই যেন একে অপরের পরিপূরক। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে নানা জাতের আমের কদর থাকলেও কিছু আমকে ঘিরে রয়েছে বিশেষ ইতিহাস, কিংবদন্তি এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতি। তেমনই এক বিরল ও ঐতিহ্যবাহী আম হল ‘দুধিয়া মালদা’, যার নামের সঙ্গে ‘মালদা’ শব্দটি জড়িয়ে থাকলেও এর প্রকৃত পরিচয় গড়ে উঠেছে বিহারের পাটনা শহরের দিঘা অঞ্চলে।
দুধিয়া মালদা আমের ইতিহাস ঘিরে রয়েছে এক আকর্ষণীয় কাহিনি। জনশ্রুতি অনুযায়ী, লখনউয়ের নবাব ফিদা হুসেন পাকিস্তানের ইসলামাবাদ থেকে এই বিশেষ আমগাছের চারা ভারতে নিয়ে আসেন। পরে তিনি পাটনার দিঘা এলাকায় সেই চারা রোপণ করেন এবং দীর্ঘদিন যত্ন নিয়ে গড়ে তোলেন আমবাগান।
এই আমের নামকরণের পেছনেও রয়েছে একটি চমকপ্রদ গল্প। স্থানীয়দের মতে, সেই সময় এলাকায় দুগ্ধ উৎপাদন প্রচুর ছিল। গরুর খামারের অতিরিক্ত দুধ নাকি বাগানে সেচের কাজে ব্যবহার করা হত। পরবর্তীকালে গাছে ফল ধরলে আমের শাঁস থেকে দুধের মতো সাদা রস বেরোতে দেখা যায়। সেখান থেকেই ‘দুধিয়া’ নামের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়।

স্বাদের দিক থেকেও এই আম অন্যদের থেকে আলাদা। এর আঁটি অত্যন্ত পাতলা, শাঁস রসালো এবং খোসা এতটাই নরম যে কাগজের মতো পাতলা বলে বর্ণনা করা হয়। আমপ্রেমীদের কাছে এই বৈশিষ্ট্যই একে বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়— বিহারে উৎপন্ন এই আমের নামের সঙ্গে ‘মালদা’ শব্দটি যুক্ত হল কেন? ইতিহাসে এর নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। গবেষকদের একাংশ মনে করেন, উৎকৃষ্ট মানের আম বোঝাতেই ‘মালদা’ নামটি যুক্ত করা হয়েছিল। কারণ বহুদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার আম সেরা মানের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
দুধিয়া মালদার জনপ্রিয়তা একসময় এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এই আমের স্বাদ নিতে আসতেন। স্থানীয়দের দাবি, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক রাজ কপূরও এই আমের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তিনি নাকি বিশেষভাবে দিঘায় এসে এই আমের স্বাদ গ্রহণ করেন এবং বিপুল পরিমাণ আম সঙ্গে নিয়ে মুম্বইয়ে ফিরে যান। যদিও এই ঘটনা মূলত স্থানীয় স্মৃতি ও জনশ্রুতির উপর ভিত্তি করে প্রচলিত।
শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও দুধিয়া মালদার পরিচিতি তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। নব্বইয়ের দশকে বিদেশে অনুষ্ঠিত একটি আম প্রদর্শনীতে এই আম বিশেষ স্বীকৃতি পেয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ফলে একসময় দুধিয়া মালদা বিহারের গর্ব হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী আমের চাষ কমতে শুরু করে। যে সব কৃষক ও উদ্যোক্তা দীর্ঘদিন ধরে এই আমের পরিচিতি ধরে রেখেছিলেন, তাঁদের মৃত্যুর পর বাগানের রক্ষণাবেক্ষণে ভাটা পড়ে। নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ, নগরায়ন এবং জমির ব্যবহার পরিবর্তনের ফলে বহু পুরনো আমবাগান হারিয়ে যায়। বাগানের কিছু অংশ অন্য কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় গাছের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
বর্তমানে দুধিয়া মালদা আমের অস্তিত্ব সীমিত কয়েকটি বাগান ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই টিকে রয়েছে। কৃষিবিদদের মতে, এই জাতের আম সংরক্ষণ করা গেলে তা শুধু কৃষি ঐতিহ্য নয়, দেশের ফলচাষের বৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
একসময় নবাবের বাগান থেকে শুরু হওয়া যে আমের খ্যাতি দেশ পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছেছিল, আজ সেই দুধিয়া মালদা ধীরে ধীরে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যাচ্ছে। তবু তার ইতিহাস, স্বাদ এবং ঐতিহ্য এখনও আমপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।