সম্প্রতি মুখে অসংখ্য সূক্ষ্ম সুচ বসিয়ে সৌন্দর্যচর্চার একটি পদ্ধতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেকের কাছেই বিষয়টি অদ্ভুত মনে হলেও এই চিকিৎসাপদ্ধতির ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরনো। আধুনিক কসমেটিক চিকিৎসার যুগেও ‘ফেশিয়াল আকুপাংচার’ এখনও বিশ্বের বহু দেশে সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার পরিপূরক চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রাচীন চিনের ঐতিহ্য
আকুপাংচারের জন্মস্থান হিসেবে চিনকে ধরা হয়। প্রাচীন চৈনিক চিকিৎসা দর্শনে বিশ্বাস করা হয়, মানবদেহে এক ধরনের জীবনীশক্তি প্রবাহিত হয়, যার ভারসাম্য নষ্ট হলে নানা অসুস্থতা দেখা দেয়। শরীরের নির্দিষ্ট কিছু বিন্দুতে অত্যন্ত সরু সুচ প্রয়োগের মাধ্যমে সেই শক্তির প্রবাহকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়।

ইতিহাসবিদদের মতে, বহু শতাব্দী আগে রাজপরিবারের সদস্যরাও তারুণ্য ধরে রাখতে এই পদ্ধতির সাহায্য নিতেন। ত্বকের রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি এবং স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা বজায় রাখার জন্য মুখ ও শরীরের বিভিন্ন অংশে সূক্ষ্ম সুচ ব্যবহার করা হত।
আধুনিক যুগে ফেশিয়াল আকুপাংচারের জনপ্রিয়তা
বর্তমানে বোটক্স, লেজার বা অন্যান্য কসমেটিক চিকিৎসার পাশাপাশি অনেকেই প্রাকৃতিক উপায়ে ত্বকের যত্ন নিতে ফেশিয়াল আকুপাংচারের দিকে ঝুঁকছেন। এই পদ্ধতিতে মুখের নির্দিষ্ট স্থানে খুব পাতলা স্টিলের সুচ অল্প সময়ের জন্য বসানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ত্বকের স্বাভাবিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সক্রিয় হতে পারে এবং কোলাজেন ও ইলাস্টিন উৎপাদন বাড়তে সহায়তা করে। এই দুই প্রোটিন ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা কী?
ত্বকের ভেতরে সূক্ষ্ম সুচ প্রবেশ করালে শরীর সেটিকে ক্ষুদ্র আঘাত হিসেবে শনাক্ত করে। এরপর সেই অংশ মেরামতের জন্য নতুন কোষ ও প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে “মাইক্রো-ট্রমা রেসপন্স” বলা হয়।
এর ফলে ত্বকে রক্তপ্রবাহ বাড়তে পারে, অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদানের সরবরাহ উন্নত হতে পারে এবং ত্বক তুলনামূলকভাবে প্রাণবন্ত দেখাতে সাহায্য করতে পারে। তবে ব্যক্তিভেদে ফল ভিন্ন হতে পারে।
শুধু সৌন্দর্য নয়, চিকিৎসাতেও ব্যবহার
আকুপাংচার কেবল রূপচর্চার জন্য সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দেশে এটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, পেশির সমস্যা, মানসিক চাপ, অনিদ্রা, হজমজনিত অসুবিধা, অ্যালার্জি, হাঁপানি এবং পুনর্বাসন চিকিৎসার পরিপূরক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যদিও সব ক্ষেত্রেই এর কার্যকারিতা সমানভাবে প্রমাণিত নয়, তবু বহু গবেষণায় কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ভারতে আকুপাংচারের প্রসারে এক বাঙালির ভূমিকা
ভারতে আকুপাংচার জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে একজন বাঙালি চিকিৎসকের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চিনে চিকিৎসা পরিষেবার কাজে গিয়ে তিনি সেখানে প্রচলিত এই প্রাচীন চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে গভীরভাবে শিক্ষা লাভ করেন। দেশে ফিরে তিনি সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় আকুপাংচারের প্রয়োগ শুরু করেন এবং পশ্চিমবঙ্গে এর প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তীকালে তাঁর উদ্যোগে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসা পরিষেবার জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, যা বাংলায় আকুপাংচারের বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
ব্যথা কি হয়?
অনেকের ধারণা, সুচ ফোটানো মানেই তীব্র যন্ত্রণা। বাস্তবে আকুপাংচারে ব্যবহৃত সুচ অত্যন্ত পাতলা ও নমনীয় হয়। প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের হাতে সঠিক পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা হলে অধিকাংশ মানুষ খুব সামান্য অস্বস্তি অনুভব করেন অথবা প্রায় কোনও ব্যথাই পান না।
চিকিৎসকের পরামর্শ কেন জরুরি?
ফেশিয়াল আকুপাংচার বা শরীরের অন্য কোনও অংশে আকুপাংচার করানোর আগে অবশ্যই প্রশিক্ষিত ও অনুমোদিত চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সঠিক রোগ নির্ণয়, স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং জীবাণুমুক্ত পরিবেশে চিকিৎসা গ্রহণ করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয়ে আকুপাংচার আজও আগ্রহের বিষয়। তবে সৌন্দর্যচর্চা হোক বা চিকিৎসা— যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞের মতামতই হওয়া উচিত প্রথম অগ্রাধিকার।
Sumi has been waiting lifestyle, vastu Tips since 2026.