মহাকাশ গবেষণার দুনিয়ায় দীর্ঘ দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র বা ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন (আইএসএস) তৈরি হওয়ার পর বিশ্বের একাধিক দেশ এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে যুক্ত হলেও তার বাইরে থেকে যেতে হয়েছিল চিনকে। রাজনৈতিক অবিশ্বাস, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তি ভাগ করে নেওয়ার বিষয়ে মার্কিন আপত্তির কারণে বেজিং কখনও আইএসএস-এর পূর্ণ অংশীদার হতে পারেনি।
২০১১ সালে মার্কিন আইনের একটি সংশোধনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ওই আইনের ফলে নাসা এবং চিন সরকারের সঙ্গে যুক্ত কোনও সংস্থার মধ্যে সরাসরি সহযোগিতার ক্ষেত্রে সরকারি অর্থ ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক মহাকাশ কর্মসূচিতে চিনের অংশগ্রহণের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
তবে এই পরিস্থিতিকে বাধা হিসেবে নয়, বরং নতুন সুযোগ হিসেবে দেখেছিল বেজিং। নিজেদের প্রযুক্তি ও সক্ষমতার উপর নির্ভর করেই পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে একটি স্বাধীন মহাকাশ স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা নেয় তারা। সেই পরিকল্পনার বাস্তব রূপই তিয়াংগং স্পেস স্টেশন, যার অর্থ ‘স্বর্গীয় প্রাসাদ’।

কয়েক দশকের প্রস্তুতির ফল
চিনের মহাকাশ কর্মসূচির শিকড় রয়েছে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। প্রথম দিকে দেশটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়নে জোর দেয়। পরে সেই প্রযুক্তিকেই কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠে তাদের মহাকাশ কর্মসূচি। ১৯৭০ সালে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে মহাকাশ যুগে প্রবেশ করে চিন। এরপর ধাপে ধাপে নিজস্ব রকেট, উপগ্রহ ও মানব মহাকাশ অভিযানের সক্ষমতা তৈরি করে দেশটি।
এই দীর্ঘ যাত্রার শেষ ধাপ হিসেবে গড়ে ওঠে তিয়াংগং। ২০২২ সালের অক্টোবরে পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উপরে কক্ষপথে থাকা এই মহাকাশ স্টেশন সম্পূর্ণরূপে চালু হয়।

তিনটি মডিউলে গড়া মহাকাশ গবেষণাগার
তিয়াংগংকে দেখতে ইংরেজি ‘টি’ অক্ষরের মতো। স্টেশনটির তিনটি প্রধান অংশ রয়েছে।
– তিয়ানহে: নিয়ন্ত্রণ ও বসবাসের মূল মডিউল।
– ওয়েনতিয়ান: জীববিজ্ঞান ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য ব্যবহৃত পরীক্ষাগার।
– মেংতিয়ান: পদার্থবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিশেষায়িত ল্যাবরেটরি।

স্টেশনটিতে সাধারণত তিন জন তাইকোনট বা চিনা মহাকাশচারী অবস্থান করেন। নির্দিষ্ট সময় অন্তর নতুন দল সেখানে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে। দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকার ফলে মানুষের শরীর ও মনের কী পরিবর্তন ঘটে, সে সম্পর্কেও গবেষণা চালানো হয়।
কী কী গবেষণা চলছে তিয়াংগংয়ে?
তিয়াংগংয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা অত্যন্ত কম মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে বিস্তৃত গবেষণার সুযোগ।

এই মহাকাশ গবেষণাগারে যেসব বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, তার মধ্যে রয়েছে—
– মহাকাশ পরিবেশে মানবদেহের পরিবর্তন;
– উদ্ভিদ চাষ ও ভবিষ্যতের খাদ্য উৎপাদন প্রযুক্তি;
– নতুন ধরনের উপাদান তৈরির সম্ভাবনা;
– বিভিন্ন পদার্থবিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা;
– জীববৈচিত্র্য ও প্রজনন-সংক্রান্ত গবেষণা।
গবেষকদের অন্যতম আগ্রহের বিষয় হল, মহাকাশের পরিবেশে জীবজগত কতটা মানিয়ে নিতে পারে। সেই কারণেই বিভিন্ন প্রাণীকে মহাকাশে পাঠিয়ে তাদের আচরণ ও শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে চাঁদ বা মঙ্গলে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
চাঁদে বসতি গড়ার প্রস্তুতি?
চিনের গবেষকরা এমন উপাদান নিয়েও কাজ করছেন, যা ভবিষ্যতে চাঁদে বা অন্য কোনও গ্রহে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। চাঁদের মাটির উপাদান ব্যবহার করে তৈরি বিশেষ নির্মাণসামগ্রী মহাকাশে রেখে তার উপর মহাজাগতিক বিকিরণ ও সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মির প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এর উদ্দেশ্য হল, ভবিষ্যতে পৃথিবী থেকে বিপুল পরিমাণ নির্মাণসামগ্রী বহন না করেই স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে চাঁদ কিংবা মঙ্গলে আবাসন তৈরির পথ খুঁজে বের করা।
তথ্য প্রকাশে কড়া নিয়ন্ত্রণ
চিনের মহাকাশ কর্মসূচি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত। ফলে তিয়াংগংয়ে চলা সব গবেষণার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসে না। কোন গবেষণার তথ্য বাইরে জানানো হবে, তা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট সরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলি। এই কারণে তিয়াংগংয়ে কী ধরনের গবেষণা চলছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও কৌতূহল রয়েছে।
আইএসএস-এর পরবর্তী বিকল্প?
আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র প্রায় তিন দশক ধরে মানব মহাকাশ গবেষণার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। তবে আগামী দশকে সেটির কার্যক্রম শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে পৃথিবীর কক্ষপথে তিয়াংগং একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উঠে আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশের গবেষকদের জন্য তিয়াংগংয়ে পরীক্ষামূলক কাজের সুযোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে বেজিং। যদিও এটি আইএসএস-এর মতো বহু দেশের যৌথ উদ্যোগ নয়, তবু ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযান এবং গভীর মহাকাশ অনুসন্ধানের প্রস্তুতিতে এই ‘স্বর্গীয় প্রাসাদ’ চিনের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি হয়ে উঠতে চলেছে।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.