নিজের শেষ ছবির সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। অথচ মৃত্যুর পর সেই ছবির সুরই হয়ে উঠেছিল তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ। আর ডি বর্মনের ‘১৯৪২: আ লাভ স্টোরি’ তাই শুধু একটি ছবির অ্যালবাম নয়, এক শিল্পীর অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প।
একসময় হিন্দি ছবির সঙ্গীতের ভাষাই বদলে দিয়েছিলেন তিনি। নতুন ধরনের শব্দ, ভারতীয় সুরের সঙ্গে পাশ্চাত্য সংগীতের মেলবন্ধন আর নিরন্তর পরীক্ষানিরীক্ষায় নিজস্ব জায়গা তৈরি করেছিলেন রাহুল দেব বর্মন, যাঁকে স্নেহ করে সবাই ডাকত ‘পঞ্চম’ নামে। কিন্তু কেরিয়ারের শেষ পর্বে ছবিটা বদলে যায়। একের পর এক ছবি প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল না হওয়ায় ইন্ডাস্ট্রির একটা বড় অংশের ধারণা হয়েছিল—আর ডি বর্মনের সময় বোধহয় শেষ।
শোনা যায়, সেই সময় তাঁকে নিয়ে এমন কথাও উঠেছিল—‘আরডি বর্মণের শেষ! আর কিছু দেওয়ার নেই তাঁর।’ কাজও কমে গিয়েছিল। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে একসময় যিনি ছিলেন বলিউডের অন্যতম চাহিদাসম্পন্ন সুরকার, তিনিই প্রায় কাজহীন হয়ে পড়েছিলেন। ঠিক সেই সময়ই তাঁর জীবনে আসে একটি ছবি—‘১৯৪২: আ লাভ স্টোরি’।
যখন পাশে দাঁড়ালেন বিধু বিনোদ চোপড়া
১৯৯৪ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবির পরিচালক ছিলেন বিধু বিনোদ চোপড়া। অভিনয়ে ছিলেন অনিল কাপুর, মনীষা কৈরালা ও জ্যাকি শ্রফ। গানের কথা লিখেছিলেন জাভেদ আখতার। আর সুরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আর ডি বর্মনকে।
কিন্তু পঞ্চমকে কেন ছবির সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল ইন্ডাস্ট্রির অন্দরেই। জাভেদ আখতারের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই সময় অনেকেই চোপড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। এমনকি আর ডি বর্মনের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি আখতারকে বলেছিলেন, পঞ্চম নাকি ‘শেষ হয়ে গিয়েছেন’। তাঁকে এই ছবিতে সুপারিশ করে আখতার হয়তো বিপদে পড়ছেন—এমন কথাও শোনা গিয়েছিল।
কিন্তু শিল্পীর প্রতিভাকে কি সত্যিই তাঁর সাম্প্রতিক সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব দিয়ে মাপা যায়? ‘১৯৪২: আ লাভ স্টোরি’ যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর হয়ে দাঁড়াল।
সাফল্য এল, কিন্তু পঞ্চম তা দেখে যেতে পারলেন না
ছবিটি মুক্তি পাওয়ার আগেই, ৪ জানুয়ারি ১৯৯৪, প্রয়াত হন আর ডি বর্মন। ফলে নিজের জীবনের শেষ ছবির সাফল্য তিনি আর দেখতে পারেননি।
এর কয়েক মাস পর, ১৫ এপ্রিল ১৯৯৪, মুক্তি পায় ‘১৯৪২: আ লাভ স্টোরি’। আর তারপর যা ঘটল, তা যেন পঞ্চমকে ‘শেষ হয়ে গিয়েছেন’ বলা মানুষদের মুখের ওপর জবাব।
ছবির গান একের পর এক জনপ্রিয় হতে শুরু করল। মানুষের মুখে মুখে ফিরতে লাগল—
– ‘এক লড়কি কো দেখা তো অ্যায়সা লাগা’
– ‘কুছ না কহো’
– ‘রিমঝিম রিমঝিম’
– ‘রুত না আয়ে’
প্রতিটি গানই হয়ে উঠল স্মরণীয়। সুরের মাধুর্য, অর্কেস্ট্রেশনের সৌন্দর্য এবং আবেগের গভীরতা মিলিয়ে অ্যালবামটি হিন্দি চলচ্চিত্রের সঙ্গীতের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিল।
মৃত্যুর পর এল স্বীকৃতি
সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয়, এই সাফল্যের সাক্ষী হতে পারেননি পঞ্চম নিজে।
‘১৯৪২: আ লাভ স্টোরি’-র সঙ্গীত তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এমনকি মৃত্যুর পর তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সেরা সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে সম্মানিত হন। যে শিল্পীকে জীবনের শেষদিকে অনেকে ‘শেষ’ বলে ধরে নিয়েছিলেন, তিনিই শেষ ছবির সুর দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন—একজন শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার শেষ বলে কিছু নেই, যতক্ষণ তাঁর হাতে সুর থাকে।
আর ডি বর্মনের গল্প তাই শুধুই সাফল্যের গল্প নয়। এটি অপমান, অবহেলা, প্রত্যাখ্যান পেরিয়ে নিজের শিল্পের ওপর বিশ্বাস রাখার গল্প। ‘১৯৪২: আ লাভ স্টোরি’ তাঁর শেষ ছবি ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই শেষটাই হয়ে উঠেছিল তাঁর অন্যতম স্মরণীয় প্রত্যাবর্তন।
পঞ্চম চলে গিয়েছিলেন।
কিন্তু তাঁর সুর থেকে গিয়েছিল।
আর সেই সুর আজও বলে—‘শেষ’ বলে যাকে আমরা মনে করি, কখনও কখনও সেখান থেকেই শুরু হয় এক শিল্পীর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.