হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা মানেই সব সময়ে বুকে ব্যথা, বুক ধড়ফড় বা শ্বাসকষ্ট হবে—এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে হৃদ্রোগের ঝুঁকি শরীরের ভিতরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়। রক্তে কোলেস্টেরল ও অন্যান্য ফ্যাটের মাত্রা, রক্তে শর্করা, বিপাকীয় সমস্যা, প্রদাহ কিংবা হৃদ্যন্ত্রের উপর বাড়তি চাপ—এই সবকিছুর সঙ্গেই হৃদ্স্বাস্থ্যের সম্পর্ক রয়েছে।
তাই শুধু সাধারণ কোলেস্টেরল পরীক্ষা করলেই হৃদ্রোগের ঝুঁকির সম্পূর্ণ ছবি সব সময়ে পাওয়া যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু অতিরিক্ত রক্তপরীক্ষা করালে ঝুঁকি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, এই ৯টি পরীক্ষা প্রত্যেকের জন্য জরুরি নয়। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, রক্তচাপ, ডায়াবিটিস, আগের অসুস্থতা এবং সামগ্রিক হৃদ্রোগের ঝুঁকি বিবেচনা করেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বেছে নেওয়া উচিত।
১. অ্যাপোলাইপোপ্রোটিন বি বা ApoB
ApoB পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে থাকা নির্দিষ্ট কোলেস্টেরল-বহনকারী কণিকার সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এই কণিকাগুলি ধমনীর দেওয়ালে চর্বির আস্তরণ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সাধারণ LDL কোলেস্টেরলের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে ApoB পরীক্ষা হৃদ্রোগের ঝুঁকি মূল্যায়নে অতিরিক্ত তথ্য দিতে পারে।
২. লাইপোপ্রোটিন(a) বা Lp(a)
হৃদ্রোগের ঝুঁকির একটি অংশ বংশগত হতে পারে। Lp(a) তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। শরীরে Lp(a)-এর মাত্রা বেশি থাকলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে পরিবারের কারও কম বয়সে হৃদ্রোগ বা হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসক এই পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
৩. hs-CRP
hs-CRP বা হাই-সেনসিটিভিটি C-reactive protein শরীরে প্রদাহের মাত্রা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। ধমনিতে প্রদাহ থাকলে তা হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে শুধু hs-CRP-এর রিপোর্ট দেখেই হৃদ্রোগের ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। অন্যান্য শারীরিক তথ্য ও পরীক্ষার ফলের সঙ্গেও এটি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৪. ফাস্টিং ইনসুলিন
খালি পেটে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা পরীক্ষা করলে শরীর ইনসুলিনের প্রতি কী ভাবে সাড়া দিচ্ছে, সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। ইনসুলিনের কার্যকারিতায় সমস্যা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার পরীক্ষার পাশাপাশি ফাস্টিং ইনসুলিনও করা হতে পারে।
৫. HbA1c
HbA1c বা হিমোগ্লোবিন A1c পরীক্ষায় গত প্রায় ২-৩ মাসে রক্তে শর্করার গড় মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে ডায়াবিটিস বা প্রিডায়াবিটিসের ঝুঁকি থাকলে এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
৬. ওমেগা-৩ ইনডেক্স
ওমেগা-৩ ইনডেক্স রক্তের লোহিত রক্তকণিকায় থাকা EPA ও DHA-এর মাত্রা সম্পর্কে ধারণা দেয়। শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের অবস্থা কেমন, তার একটি ধারণা এই পরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে। তবে এই পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা ব্যক্তিভেদে আলাদা।
৭. ট্রাইগ্লিসারাইড-টু-HDL অনুপাত
রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড ও HDL কোলেস্টেরলের মাত্রার মধ্যে সম্পর্ক বোঝাতে এই অনুপাত ব্যবহার করা হয়। এটি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের একটি সূচক হতে পারে। তবে শুধু এই অনুপাতের ভিত্তিতে হৃদ্রোগের ঝুঁকি নির্ধারণ করা ঠিক নয়। LDL, রক্তে শর্করা, রক্তচাপ এবং অন্যান্য ঝুঁকির কারণও বিবেচনা করতে হয়।
৮. ভিটামিন D
ভিটামিন D-এর ঘাটতির সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তবে ভিটামিন D কম থাকলেই যে হৃদ্রোগ হবে, এমন নয়। একই ভাবে শুধুমাত্র ভিটামিন D-এর সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলেই হৃদ্রোগ প্রতিরোধ করা যায়—এমন প্রমাণও নেই। তাই রিপোর্টে ঘাটতি ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
৯. NT-proBNP
NT-proBNP হৃদ্যন্ত্রের উপর বাড়তি চাপ পড়ছে কি না, তা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি রক্তপরীক্ষা। বিশেষ করে হার্ট ফেলিয়োরের মতো পরিস্থিতি মূল্যায়নে চিকিৎসকেরা এই পরীক্ষার ফল ব্যবহার করেন। হৃদ্যন্ত্রের উপর চাপ তৈরি হলে উপসর্গ স্পষ্ট হওয়ার আগেও কিছু ক্ষেত্রে এই পরীক্ষায় তার ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।
শুধু রিপোর্ট নয়, দরকার সামগ্রিক মূল্যায়ন
হৃদ্রোগের ঝুঁকি বুঝতে একটি মাত্র রক্তপরীক্ষার উপর নির্ভর করা ঠিক নয়। কোলেস্টেরল, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, ওজন, জীবনযাপন, ধূমপানের অভ্যাস, বয়স এবং পারিবারিক ইতিহাস—সবকিছু মিলিয়েই সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়।
শিশু হাঁটার সময়ে একদিকে হেলে থাকে? মেরুদণ্ড বাঁকা হওয়ার এই লক্ষণগুলি চিনুন
তাই নিজের ইচ্ছায় একসঙ্গে সব পরীক্ষা না করিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলি বেছে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। রিপোর্টে কোনও মান অস্বাভাবিক এলেই আতঙ্কিত না হয়ে তার অর্থ চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
Sumi has been waiting lifestyle, vastu Tips since 2026.