আজকাল অনেকেই বলেন— কিছুই ভাল লাগে না। পছন্দের খাবার, প্রিয় গান, কাছের মানুষ কিংবা বহু প্রতীক্ষিত সাফল্য— কোনও কিছুই যেন আর আনন্দ দেয় না। এই অনুভূতিকে অনেক সময় সাধারণ অবসাদ বা মনখারাপ বলে মনে করা হয়। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের জগতে এর আলাদা পরিচয় রয়েছে। সেই অবস্থার নাম ‘অ্যানহেডোনিয়া’।
অ্যানহেডোনিয়া এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ ধীরে ধীরে আনন্দ অনুভব করার ক্ষমতা হারাতে থাকেন। জীবনের ছোট ছোট সুখের মুহূর্তও তখন অর্থহীন মনে হয়। আগে যে কাজ করতে ভাল লাগত, তাতেও আর উৎসাহ আসে না। ফলে ব্যক্তি ক্রমশ উদাসীন, ক্লান্ত এবং মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
কী এই অ্যানহেডোনিয়া?
মনোবিদদের মতে, আনন্দ, তৃপ্তি বা উচ্ছ্বাস অনুভব করতে না পারার অবস্থাই হল অ্যানহেডোনিয়া। এটি শুধুমাত্র মনখারাপ নয়, বরং অনুভূতির গভীরে তৈরি হওয়া এক ধরনের শূন্যতা।
ধরা যাক, কেউ বহু পরিশ্রমের পরে চাকরি পেলেন। সাধারণ ভাবে যা আনন্দের কারণ হওয়ার কথা, সেটিও তাঁকে সুখী করতে পারল না। আবার কেউ প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটিয়েও আনন্দ পাচ্ছেন না। এমনকি হাসির গল্প বা বিনোদনের বিষয়ও বিরক্তির কারণ হয়ে উঠছে। এই দীর্ঘস্থায়ী অনুভূতিহীনতাই অ্যানহেডোনিয়ার প্রধান লক্ষণ।
কেন হয় এই সমস্যা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর নেপথ্যে শুধু মানসিক নয়, মস্তিষ্কের জৈবিক পরিবর্তনও দায়ী। মানুষের মস্তিষ্কে একটি বিশেষ অংশ রয়েছে, যাকে ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ বলা হয়। কোনও আনন্দদায়ক কাজ করলে এই অংশ সক্রিয় হয়ে ভাল লাগার অনুভূতি তৈরি করে।
কিন্তু অ্যানহেডোনিয়ার ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে পছন্দের কাজ করলেও মস্তিষ্ক থেকে আনন্দের প্রতিক্রিয়া আসে না।
এ ছাড়া ডোপামিন নামের নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য নষ্ট হলেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডোপামিনকে সাধারণত উদ্যম ও প্রেরণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এর মাত্রা কমে গেলে মানুষ আগ্রহ ও উৎসাহ হারাতে শুরু করেন।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ, সম্পর্কের টানাপড়েন, অতীতের আঘাত বা একাকীত্ব থেকেও অ্যানহেডোনিয়ার জন্ম হতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে শরীরে কর্টিসল হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়, যা ধীরে ধীরে মনের স্বাভাবিক অনুভূতিগুলিকে প্রভাবিত করে।
অ্যানহেডোনিয়ার লক্ষণ
কোনও কিছুতেই আনন্দ না পাওয়া
আগে ভাল লাগত এমন কাজেও অনাগ্রহ
সামাজিক সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাওয়া
মানসিক ক্লান্তি ও উদাসীনতা
হাসি, উচ্ছ্বাস বা আবেগের প্রকাশ কমে যাওয়া
সব সময় নেতিবাচক চিন্তা ঘিরে থাকা
কী ভাবে মোকাবিলা সম্ভব?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যার সমাধান সব সময় ওষুধে হয় না। বরং ইতিবাচক মানসিক চর্চা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হতে পারে। বর্তমানে ‘পজিটিভ এফেক্ট ট্রিটমেন্ট’ নামে একটি পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হল, মানুষের জীবনে ছোট ছোট ভাল লাগার মুহূর্তগুলিকে আবার ফিরিয়ে আনা।
অতীতের খারাপ অভিজ্ঞতা বা দুঃখকে জোর করে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা না করে, জীবনের ইতিবাচক দিকগুলিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন মনোবিদরা। ছোট ছোট আনন্দ, প্রিয় অভ্যাস, কাছের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা নিজের ভাল লাগার কাজের মধ্যে ধীরে ধীরে মনকে ফিরিয়ে আনাই হতে পারে সুস্থ হওয়ার পথ।
কেন সচেতনতা জরুরি?
শরীরের অসুখ নিয়ে যত আলোচনা হয়, মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা এখনও ততটা গুরুত্ব পায় না। অথচ অ্যানহেডোনিয়ার মতো সমস্যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তা গুরুতর অবসাদ বা মানসিক অসুস্থতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তাই দীর্ঘ সময় ধরে যদি কোনও কিছুতেই আনন্দ না পাওয়া, উদাসীনতা বা মানসিক শূন্যতা অনুভূত হয়, তবে বিষয়টিকে হালকা ভাবে না নেওয়াই ভাল। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
জীবনে ভাল ও খারাপ সময় আসবেই। কোনও অনুভূতিই স্থায়ী নয়— এই বিশ্বাস ধরে রাখাই অন্ধকার সময় থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম ধাপ হতে পারে।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than five years.