বারুইপুরে ১২ বছর বয়সী এক নাবালিকার অপহরণ, গণধর্ষণ এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সমগ্র রাজ্যে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক ভূমিকা নিয়ে উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। স্থানীয় বাসিন্দা, নির্যাতিতার পরিবার, বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহিলা সংগঠন—সকলেই অভিযোগ তুলেছেন, অভিযোগ দায়েরের পরও পুলিশ প্রথমদিকে প্রয়োজনীয় তৎপরতা দেখায়নি। এরই মধ্যে সোমবার এসটিএফ ও এসওজি-র যৌথ অভিযানে মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সাত দিনের মধ্যে রাজ্য পুলিশের ডিজি-র কাছে রিপোর্ট তলব করেছে জাতীয় মহিলা কমিশন।
পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ
নির্যাতিতার পরিবারের দাবি, শনিবার বিকেলে বান্ধবীর জন্মদিনের উপহার কিনতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ষষ্ঠ শ্রেণির ওই ছাত্রী। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা এবং স্থানীয় যুবকেরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। রাত ৯টার দিকে থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করা হলেও অভিযোগ, পুলিশ শুরুতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং স্থানীয়রাই সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করেন এবং কয়েকজনকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারকে রবিবার স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হলেও পরে রহস্যজনকভাবে তাঁকে চলে যেতে দেওয়া হয়। পরে সোমবার তাঁকেই মূল অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেফতার করা হয়। কেন অভিযুক্তকে আটকে রাখা হয়নি এবং কেন প্রাথমিক তদন্তে শিথিলতা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
Subhasree: বারুইপুরের নৃশংস অপরাধ নিয়ে মুখ খুললেন শুভশ্রী, অসহায়তা প্রকাশ করলেন অভিনেত্রী
নির্যাতিতার কাকার অভিযোগ, শুরুতে পুলিশের স্পষ্ট অবহেলা ছিল। পরে অবশ্য থানার আইসি, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা এবং মুখ্যমন্ত্রী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
বিরোধীদের তোপ
ঘটনাস্থলে গিয়ে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, শুধু অপরাধীদের নয়, যাঁদের গাফিলতির কারণে তদন্তে বিলম্ব হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাঁর অভিযোগ, পরিবার পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিল, স্থানীয় মানুষ অভিযুক্তদের চিহ্নিতও করেছিলেন, তবু পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।
মহিলাদের ‘রাত দখল’ কর্মসূচির আহ্বায়ক রিমঝিম সিংহও প্রশ্ন তোলেন, কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তির কথায় তদন্ত ছাড়াই অভিযুক্তদের কীভাবে ছেড়ে দেওয়া হল।
সারাভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা কমিটিও বারুইপুর থানায় চিঠি দিয়ে অভিযোগ করেছে, ঘটনার পর প্রায় ছয় ঘণ্টা পুলিশ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি।
জাতীয় মহিলা কমিশনের হস্তক্ষেপ
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় জাতীয় মহিলা কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রাজ্যের ডিজি-র কাছে সাত দিনের মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি, প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপ এবং একই ঘটনায় গণপিটুনিতে এক যুবকের মৃত্যুর বিষয়েও রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।
গ্রেফতার ও আইনি পদক্ষেপ
ঘটনায় প্রথমে প্রভাস মণ্ডল ও দিবাকর সর্দার নামে দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাঁদের বারুইপুর আদালতে তোলা হলে সরকারি পক্ষ তদন্তের স্বার্থে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের আবেদন জানায়। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছে। মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারকে মঙ্গলবার আদালতে তোলা হবে।
মামলায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধর্ষণ, গণধর্ষণ, খুন, তথ্যপ্রমাণ লোপাট এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি পকসো আইনের ৬ নম্বর ধারাতেও মামলা দায়ের হয়েছে।
ময়নাতদন্তে উঠে এল ভয়াবহ তথ্য
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। চিকিৎসকদের মতে, নাবালিকাকে হত্যা করার পর নয়, জীবিত অবস্থাতেই বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর ফুসফুসে কাদা-জল পাওয়া গিয়েছে, যা থেকে তদন্তকারীদের অনুমান, জলে ফেলার সময়ও তিনি জীবিত ছিলেন।
রিপোর্টে আরও উল্লেখ রয়েছে, যৌনাঙ্গে একাধিক আঘাতের চিহ্ন, মাথায় গুরুতর আঘাত এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের প্রমাণ মিলেছে। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং জলে ডুবে শ্বাসরোধ—এই দুই কারণ মিলেই মৃত্যু হয়েছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে। সিসিটিভি ফুটেজ, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে ঘটনার পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘‘(নির্যাতিতার) বাবা যা যা চেয়েছেন, সব করবে মুখ্যমন্ত্রী। আমি খুশি, ওঁরা আস্থা রেখেছেন।’’ মুখ্যমন্ত্রী জানান, পরিবারের তরফে চার জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিন জনকে আটক করা হয়েছে, যাঁদের সঙ্গে পলাতক দু’জনের কথোপকথন হয়েছে। আইজি, এসটিএফ কাজ করছে। বারুইপুরে গোলমালের যে ঘটনা ঘটেছে, তাতেও কাউকে রেয়াত করা হবে না বলেই হুঁশিয়ারি দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘বাকি যাঁরা অতৃপ্ত আত্মা রয়েছেন, ভোটে হেরে যাঁরা ঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন, এখনও ঘরে রয়েছেন, তিন জন মিলে যে তিনটে কাণ্ড করেছেন, তাঁদেরও ভুগতে হবে। এমন ভোগাব বুঝতে পারবে।’’ ওই বিক্ষোভের সঙ্গে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে দেশজোড়া আন্দোলনের তুলনা টানেন মুখ্যমন্ত্রী। রবিবার বারুইপুরকাণ্ডের প্রেক্ষিতে যে যুবকের গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়, সেই ঘটনায় সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিত। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘গণপিটুনির ঘটনায় সাম্প্রদায়িক যোগ ছিল। এখনই কিছু বলব না। যে ভাবে রেললাইন উপড়ানো হয়েছে, অতীত মনে পড়ে যাচ্ছে। ২০১৯ সালে সিএএ বিরোধী আন্দোলন বা কিছু দিন আগে ওয়াকফ আইন বিরোধী আন্দোলন। সিআরপিএফ-এর দুই জওয়ান আহত। একটা পুলিশের গাড়ি পোড়ানো হয়েছে।’’ মুখ্যমন্ত্রীর মতে, এই ঘটনাগুলির নেপথ্যে রয়েছে ভোটে হেরে যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলি। তাদের ‘ভুগতে হবে’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। শুভেন্দুর সংযোজন, ‘‘জঘন্যতম অপরাধের মামলা ছাড়া আরও তিনটি হয়েছে। প্রথমটার বিচার দেব। ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট (মৃত্যুদণ্ড) দেব।’’
প্রতিবাদ অব্যাহত
ঘটনার প্রতিবাদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন রাস্তায় নেমেছে। নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবির। কালীঘাটে মোমবাতি মিছিল করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীও। অন্যদিকে, বিভিন্ন বিরোধী দল এবং নাগরিক সংগঠন পুলিশের ভূমিকার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছে।
তদন্তে মূল প্রশ্ন
বারুইপুরের এই নৃশংস ঘটনার তদন্তে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—যখন মূল অভিযুক্তকে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখন তাঁকে কেন ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল? অভিযোগ পাওয়ার পর কেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? পুলিশের প্রাথমিক ভূমিকার এই বিতর্কই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি নাবালিকার মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা, সম্ভাব্য পূর্বপরিকল্পনা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন তদন্তকারী সংস্থার প্রধান লক্ষ্য।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.