‘হাতটা বাড়িয়ে ছিল, তুলতে পারলাম না!’ চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু, চোখের সামনে স্বজন হারিয়ে শোকে পাথর পরিবার

রিলসে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল পুজোমণ্ডপ। সেই রিলস দেখেই নদিয়া থেকে স্ত্রী ও শ্যালিকার মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে এসেছিলেন এক ব্যক্তি। কিন্তু সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে ঠাকুর দেখার আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হল ভয়াবহ অভিজ্ঞতায়। ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারালেন তাঁর স্ত্রী। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাত বছরের শিশু। একই ঘটনায় মায়ের সামনে মেয়ের, ছেলের সামনে মায়ের এবং স্বামীর সামনে স্ত্রীর এমন মর্মান্তিক পরিণতি শোকের ছায়া নামিয়েছে একাধিক পরিবারে।

নদিয়ার বাসিন্দা ওই ব্যক্তির দাবি, বৃষ্টি শুরু হতেই মণ্ডপের প্রবেশপথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ভিড় সামলাতে গিয়ে দড়ি সরিয়ে দেওয়া হয় এবং দর্শনার্থীদের দ্রুত ভিতরে ঢোকানো হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভিড় সামলানো সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর। তাঁর কথায়, ‘‘যেই বৃষ্টি শুরু হল, ওরা দড়ি তুলে নিল। সবাইকে হুড়মুড়িয়ে ঢুকিয়ে নিয়েছিল। ঢুকিয়ে দেওয়ার পর আর সামলাতে পারছিল না। বাঁশি বাজাচ্ছিল, বলছে বেরিয়ে যাও। কিন্তু এত লোক একসঙ্গে বেরোবে কীভাবে!’’ এরপরই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে দাবি তাঁর। ভিড়ের ধাক্কায় মাটিতে পড়ে যান তাঁর স্ত্রী এবং শ্যালিকার মেয়ে। তিনি নিজেও ছিটকে অনেকটা দূরে চলে যান। স্ত্রীকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেও শেষরক্ষা করতে পারেননি। কান্নাভেজা গলায় তিনি বলেন, ‘‘আমার বউয়ের গায়ে অত জোর নেই। ও সবার নীচে পড়ে যায়। আমি চেষ্টা করেছিলাম। তুলতে পারলাম না। হাত বার করে ছিল এভাবে! আমি একা হয়ে গেছি।’’

সেদিন মায়ের হাত ধরে ঠাকুর দেখতে এসেছিল সাত বছরের এক শিশু। কিন্তু ভিড়ের চাপে মায়ের হাত থেকে ছিটকে যায় সে। বর্তমানে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেন দিয়ে তার চিকিৎসা চলছে। শিশুটির শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে। শিশুটির দাদু জানান, মণ্ডপের সামনের রাস্তাটি ছিল অত্যন্ত সরু এবং অন্ধকার। তার উপর প্রচণ্ড ভিড় থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, ‘‘রাস্তা খুব অন্ধকার ছিল। সরু ছিল। কনজেস্টেড জায়গা। হুড়মুড় করে বেরোতে গিয়েই হল। নাতনির অক্সিজেন দিচ্ছে। এক্স-রে হচ্ছে।’’ পরিবারের সদস্যদের উদ্বেগ, ছোট্ট মেয়েটি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক। কিন্তু যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন সকলে। মায়ের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে এসেছিলেন ২৫ বছরের সোনু পাল। কিন্তু পুজোর আনন্দের মুহূর্তেই তাঁর সামনে ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা। ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর মায়ের।

ঘটনার পরেও আতঙ্ক কাটেনি যুবকের। চোখের সামনে মাকে হারানোর শোকের পাশাপাশি নিজের প্রাণে বেঁচে ফেরার স্বস্তিও যেন তাঁকে স্বাভাবিক হতে দিচ্ছে না।

সোনুর কথায়, ‘‘আমিও হয়তো বাঁচতাম না।’’

মুখ থেঁতলে গিয়েছে জুতোর চাপে, শেষরক্ষা হল না ১৩ বছরের প্রাঞ্জলের আগরপাড়া থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে এসেছিল ১৩ বছরের প্রাঞ্জল সরকার। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে পড়ে গিয়ে আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি সে। কোনওভাবে বাবা-মায়ের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় কিশোরটি। উদ্ধার করার সময় ততক্ষণে সব শেষ। প্রাঞ্জলের মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছন তাঁর মামা। সেখানে সারি সারি দেহ পড়ে থাকতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি।

ভাগ্নের দেহ শনাক্ত করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমি এসে দেখি সারি সারি বডি রাখা রয়েছে। ওর মুখটা দেখলাম। মুখটা জুতোয় পুরো থেঁতলে গিয়েছে।’’ একটি পরিবারের কাছে পুজোর আনন্দ যে কীভাবে চরম শোকে পরিণত হল, প্রাঞ্জলের মৃত্যু তারই মর্মান্তিক উদাহরণ।

চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপের সামনের রাস্তা সরু হওয়ায় সেখানে দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি। তাঁদের অভিযোগ, মণ্ডপে প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ঘোষণা সঠিকভাবে করা হয়নি। এর ফলে দর্শনার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের একাংশের আরও অভিযোগ, মণ্ডপে পর্যাপ্ত পুলিশকর্মী ছিলেন না। তাঁদের দাবি, মূলত ভিআইপি গেটেই পুলিশ মোতায়েন ছিল। দুর্ঘটনার পর আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রশাসনের তরফে পর্যাপ্ত সাহায্য মেলেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা নির্ধারণের জন্য বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন।

পুজোর মরসুমে কলকাতার মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই ভিড় সামলানোর ব্যবস্থা, নিরাপদ প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানোর প্রস্তুতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, চোরবাগানের এই মর্মান্তিক ঘটনা ফের সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিল। স্বজন হারানো পরিবারগুলির কাছে এখন পুজোর স্মৃতি মানেই এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, যা সহজে মুছে যাওয়ার নয়।

শুধু হজম শক্তি বাড়িয়ে দেয় না, জোয়ান খেলে শরীরের অনেক সমস্যা নিবারণ হয় মুখরোচক বাদাম চিক্কি খেতে দারুন, বাড়িতেই তৈরী হবে, জানুন রেসিপি এইভাবে তেজপাতা পোড়ালে দুশ্চিন্তা কেটে যাবে 5 Best Night Creams ৪ মাসের শিশু ২৪০ কোটির মালিক