পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক মহলে আবারও চর্চার কেন্দ্রে আইএএস অফিসার নন্দিনী চক্রবর্তী। রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের প্রধান সচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি রাজ্যের নতুন স্বরাষ্ট্রসচিব হিসেবে দায়িত্ব পেলেন। প্রশাসনিক মহলের মতে, তাঁর কর্মজীবনের ইতিহাস যেন বারবার উত্থান, বিতর্ক, পতন এবং পুনরুত্থানের গল্প বলেছে।
১৯৯৪ ব্যাচের আইএএস অফিসার নন্দিনী চক্রবর্তী উচ্চশিক্ষা লাভ করেন জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বাম আমলে প্রশাসনে যোগ দিলেও ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসার পরে তিনি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে শুরু করেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর আস্থাভাজন আমলাদের তালিকায় তাঁর নাম উঠে আসে।
প্রথম দিকে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর করা হয়। একই সঙ্গে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্বও সামলান তিনি। প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য দ্রুত গুরুত্ব বাড়লেও ২০১২ সালে একটি ঘটনা তাঁর কর্মজীবনে বড় মোড় আনে।

বারাসতের এক যাত্রা উৎসব চলাকালীন তিনি জানতে পারেন, তাঁর মেয়ে অসুস্থ। সেই কারণে পরদিন পানাগড়ে ‘মাটি উৎসব’-এ উপস্থিত থাকতে পারবেন না বলে মুখ্যমন্ত্রীকে জানান। পরে ওই অনুষ্ঠানে তাঁর অনুপস্থিতি প্রশাসনের শীর্ষস্তরে অসন্তোষ তৈরি করে। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বের দায়িত্বে পাঠানো হয়। শিল্পোন্নয়ন নিগম এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর থেকে সরিয়ে তাঁকে স্টেট গেজেটিয়ারের সম্পাদক করা হয়েছিল।
তবে সেই পর্যায় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কয়েক মাসের মধ্যেই আবার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রত্যাবর্তন ঘটে তাঁর। তাঁকে সুন্দরবন বিষয়ক দফতরের সচিব করা হয়। কিন্তু সেখানেও বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি। তৎকালীন মন্ত্রী মন্টুরাম পাখিরার কিছু কাজ নিয়ে আপত্তি তোলায় প্রশাসনিক অন্দরে নতুন করে সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়। এর জেরেও তাঁকে আবার অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পাঠানো হয় এবং প্রেসিডেন্সি রেঞ্জের কমিশনার করা হয়।

একাধিকবার কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন নন্দিনী। প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, অন্তত তিনবার তিনি কেন্দ্রীয় ডেপুটেশনের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু রাজ্য সরকার সেই আবেদন মঞ্জুর করেনি। পরবর্তী সময়ে আবারও তাঁর প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়ে এবং তিনি পর্যটন দফতরের সচিব হন।

এরপর রাজভবনে তাঁর প্রবেশ ঘটে। প্রাক্তন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় উপরাষ্ট্রপতি হওয়ার পর অন্তর্বর্তী রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব নেন লা গণেশন। সেই সময় থেকেই রাজভবনের প্রশাসনিক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেন নন্দিনী। পরে স্থায়ী রাজ্যপাল হিসেবে সিভি আনন্দ বোস দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি তাঁর প্রধান সচিব হন।

কিন্তু সেখানেও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাজ্যপালের ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, ওই ভাষণের খসড়া নন্দিনীই তৈরি করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে বিজেপি তীব্র সমালোচনা শুরু করলে রাজভবনের অন্দরে অসন্তোষ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে রাজ্যপালের প্রধান সচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তিনি আবার পর্যটন দফতরে ফিরে যান।
তবে প্রশাসনিক অন্দরে তাঁর প্রত্যাবর্তন আবারও চমক তৈরি করেছে। পর্যটন দফতর থেকে এবার সরাসরি রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিবের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফিরলেন নন্দিনী চক্রবর্তী। রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, তাঁর কর্মজীবন পশ্চিমবঙ্গের আমলাতন্ত্রে উত্থান-পতনের এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে থাকবে।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than five years.