ওড়িশা সীমান্তের কাছাকাছি তালসারি সমুদ্রসৈকতে শুটিং করতে গিয়ে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা এখনো ঘিরে রয়েছে নানা ধোঁয়াশা। ঠিক কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থলে উপস্থিত শুটিং ইউনিটের সদস্য, স্থানীয় মানুষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে বেশ কিছু অসঙ্গতি উঠে এসেছে, যা ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুটিংয়ের সময়কার ক্যামেরায় ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজ এখন তদন্তকারীদের হাতে রয়েছে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, রাহুল এবং তাঁর সহ-অভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্র সমুদ্রের তুলনামূলক গভীর অংশের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। আচমকা একটি প্রবল ঢেউয়ের ধাক্কায় দু’জনেই ভারসাম্য হারিয়ে জলে পড়ে যান। পরে ইউনিটের সদস্যরা এবং স্থানীয়রা মিলে শ্বেতাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন। কিন্তু রাহুলকে বেশ কিছু সময় খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাঁকে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে দ্রুত গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। দিঘা মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই ঘটনাই এখন বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—সেটা কি শুটিংয়ের দৃশ্য ছিল, নাকি শুটিং শেষ হওয়ার পর ব্যক্তিগতভাবে জলে নেমেছিলেন অভিনেতা?
ওড়িশা পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, সমুদ্রতটে থাকা চোরাবালির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে শুটিং ইউনিটের এক সদস্য শেখর চক্রবর্তী দাবি করেছেন, রাহুলকে নাকি জলে নামতে বারণ করা হয়েছিল। তাঁর কথায়, অভিনেতা সাঁতার জানতেন না, তবু তিনি জলে নেমেছিলেন।

অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের বক্তব্য কিছুটা আলাদা। তাঁদের মতে, প্রথমে সহ-অভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্র ঢেউয়ের ধাক্কায় পড়ে যান। তাঁকে বাঁচাতে গিয়েই রাহুল জলে ঝাঁপ দেন এবং তখনই তিনি বিপদের মুখে পড়েন। শুটিং ইউনিটের প্রায় ২০ জন সদস্যের সামনে পুরো ঘটনাটি ঘটে বলে জানা গেছে।
সহ-অভিনেতা ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ঘটনার সময় রাহুল সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন এবং তিনি কোনও ধরনের নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন না। এতে স্পষ্ট যে দুর্ঘটনার পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে কি না, তা নিয়েও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
স্থানীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গাইও সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, তালসারি সমুদ্রের ওই এলাকায় চোরাবালির সমস্যা রয়েছে। তাঁর দাবি, সম্ভবত সেই কারণেই রাহুল ভেসে গিয়েছিলেন। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, শুটিংয়ের জন্য যথাযথ অনুমতি নেওয়া হয়নি এবং ইউনিটের সদস্যরা নিজেরাই সমুদ্রে নেমে শুটিং করছিলেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে স্থানীয় এক নুলিয়ার বক্তব্যে। তাঁর দাবি, তিনিই প্রথম দু’জনকে উদ্ধার করে নৌকায় তোলেন। তখন অভিনেতা অনেকটা জল গিলে ফেলেছিলেন বলে জানা যায়।
ঘটনাকে ঘিরে আরও একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে শুটিংয়ের প্রকৃতি নিয়ে। কেউ কেউ বলছেন, সমুদ্রের মধ্যে একটি নাচের দৃশ্যের শুটিং চলছিল, যেখানে রাহুল ও শ্বেতা হাত ধরে জলে নেমেছিলেন। কিন্তু সিরিয়ালের লেখিকা লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের দাবি, গল্পে গভীর জলে শুটিংয়ের কোনও দৃশ্যই ছিল না। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সেই সময় ঠিক কী শুট করা হচ্ছিল।
এছাড়াও কিছু সূত্রের দাবি, রাহুলকে যখন জল থেকে উদ্ধার করা হয় এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখনও নাকি তাঁর কিছুটা জ্ঞান ছিল। তবে এই তথ্যের সত্যতা এখনও নিশ্চিত হয়নি।
এদিকে তদন্তের স্বার্থে পুলিশ শুটিং ইউনিটের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। রবিবার রাতে কাঁথি থানার পুলিশ একজন শুটিং স্টাফকে খুঁজে পায়নি বলেও খবর পাওয়া গেছে। ফলে সন্দেহ ও জল্পনা আরও বাড়ছে।
রাহুলের মরদেহের ময়নাতদন্ত তাম্রলিপ্ত গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে সম্পন্ন হওয়ার কথা। তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ রাখতে ভিডিওগ্রাফিও করা হতে পারে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট সামনে এলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঘটনার পর চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী এবং পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়সহ অনেকেই এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সত্যিটা সামনে আসা খুবই জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা আর না ঘটে।
সব মিলিয়ে তালসারির সমুদ্রতটে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা এখন একাধিক প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে। ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফল—সবকিছুর উপরই নির্ভর করছে এই মৃত্যুর আসল কারণ উদ্ঘাটন।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.