দুর্গাপুজোয় দেবী দুর্গার আরাধনায় মেতে ওঠে গোটা বাংলা। কিন্তু যে সমাজ নারীশক্তির প্রতীক হিসেবে দেবীকে পুজো করে, সেই সমাজেই কেন বাস্তবের নারীদের সম্মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে? কেন পেশা কিংবা পরিচয়ের কারণে কোনও নারীকে অসম্মানের শিকার হতে হয়? দুর্গাপুজোর আবহে এমনই একাধিক প্রশ্ন তুলে ধরলেন কলকাতার ডিজিটাল ক্রিয়েটর হেমশ্রী ভদ্র। সাহসী ফটোশুটের মাধ্যমে সমাজের প্রচলিত ধারণা এবং দ্বিচারিতাকে সামনে নিয়ে এসেছেন ইনস্টাগ্রামে প্রায় ১২ লক্ষ অনুরাগীর অধিকারী এই ইনফ্লুয়েন্সর।
হেমশ্রীর ফটো সিরিজে নজর কেড়েছে তাঁর সাবেকি সাজ। উজ্জ্বল লাল হাতকাটা ব্লাউজের সঙ্গে সাদা শাড়িতে ধরা দিয়েছেন তিনি। দুর্গাপ্রতিমাকে সামনে রেখে তোলা ছবিগুলিতে সাহসী উপস্থাপনার পাশাপাশি রয়েছে গভীর সামাজিক বার্তা। তবে এই ফটোশুটের মূল আকর্ষণ কেবল তাঁর পোশাক কিংবা বোল্ড লুক নয়, বরং ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে যে মাটিকে পবিত্র বলে গ্রহণ করা হয়, সেই মাটির সঙ্গে যুক্ত নারীদের সমাজ কেন অবজ্ঞার চোখে দেখে?
বাংলার দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক প্রাচীন প্রথা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতিমা তৈরির মাটির সঙ্গে যৌনকর্মীদের বাড়ির দোরগোড়া থেকে সংগ্রহ করা মাটি মেশানো হয়। এই মাটিকে ঘিরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের পাশাপাশি নানা প্রতীকী ব্যাখ্যাও প্রচলিত রয়েছে। সেই প্রথাকেই নিজের ফটোশুটের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন হেমশ্রী। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, যে মাটি দেবীর প্রতিমা নির্মাণের জন্য পবিত্র বলে বিবেচিত হয়, সেই মাটির সঙ্গে যুক্ত নারীরাই কেন সমাজের চোখে অবহেলিত? তাঁদের পেশার কারণে কেন তাঁদের মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে?

ফটো সিরিজের একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, হেমশ্রী দু’হাতে এক ব্যক্তির হাতে মাটি তুলে দিচ্ছেন। ওই ব্যক্তি মাথা নত করে সেই মাটি গ্রহণ করছেন। ছবিটির মধ্য দিয়ে সম্মান এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈপরীত্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। যে মাটি শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করা হচ্ছে, সেই মাটি যাঁর কাছ থেকে আসছে, তাঁর প্রতি সমাজের মনোভাব কেন আলাদা হবে, সেই প্রশ্নই যেন উঠে এসেছে ছবিতে। ফটো সিরিজের অন্য ছবিগুলিতেও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। একটি ছবিতে রূপটানশিল্পীকে হেমশ্রীর চোখে কাজল পরিয়ে দিতে দেখা যায়। অন্য একটি ছবিতে শুটিংয়ের কাজে ব্যবহৃত ক্যামেরা, আলো এবং কলাকুশলীদের উপস্থিতি ফুটে উঠেছে। আবার একটি ছবিতে আয়নার আড়ালে ঢাকা রয়েছে তাঁর মুখ।
এই উপাদানগুলিকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে নারীর পরিচয়, সৌন্দর্য এবং সামাজিক মূল্যায়নের বিষয়টি সামনে এনেছেন হেমশ্রী। সমাজ কীভাবে একজন নারীকে দেখে, তাঁর পোশাক কিংবা পেশার ভিত্তিতে কীভাবে তাঁকে বিচার করে, সেই প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে তাঁর এই শিল্পভাবনা।

হেমশ্রীর এই ফটোশুটের মূল বক্তব্য, দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং বাস্তব জীবনে নারীর প্রতি অবজ্ঞা—এই দুই অবস্থান কখনও একসঙ্গে চলতে পারে না। দুর্গাপুজোয় নারীশক্তির বন্দনা করা হলেও বাস্তব জীবনে বহু নারীকে তাঁদের পেশা, পরিচয়, পোশাক কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্যের কারণে সামাজিক বিচার ও অসম্মানের মুখোমুখি হতে হয়। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে, একজন নারীর মানবিক মর্যাদা কখনও তাঁর পেশা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। প্রত্যেক নারীর প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন।
এই ফটো সিরিজের উদ্দেশ্য মা দুর্গার প্রতি মানুষের বিশ্বাস কিংবা ভক্তিকে আঘাত করা নয়। বরং দেবীর আরাধনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রদ্ধা ও মর্যাদার মূল্যবোধকে বাস্তব জীবনেও প্রতিষ্ঠা করার বার্তা দিতে চেয়েছেন হেমশ্রী।
সব মিলিয়ে, দুর্গাপুজোর আবহে হেমশ্রীর এই সাহসী ফটোশুট নারীসম্মান, সামাজিক বৈষম্য এবং প্রচলিত ধারণা নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি করেছে। যে সমাজ দেবীকে মাতৃশক্তি হিসেবে পুজো করে, সেই সমাজে প্রত্যেক নারী কি সমান সম্মান পান? হেমশ্রীর ছবির মাধ্যমে উঠে আসা এই প্রশ্নই আলোচনার কেন্দ্রে।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.