বাংলার নাট্যজগৎ দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক শিল্পক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছে। বাংলা সিনেমা, টেলিভিশন ধারাবাহিক কিংবা ওয়েব সিরিজ়ের মতো নাট্যচর্চাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার দাবি বহু দিনের। সেই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের একটি ঘোষণা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, পুণের চলচ্চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধাঁচে বাংলাতেও একটি আধুনিক নাট্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
অমিত শাহের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলা দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তাই এই ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করতে নাট্যশিক্ষার পরিকাঠামো উন্নত করা প্রয়োজন। তাঁর এই মন্তব্যের পর থেকেই নাট্যসমাজে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। অনেকেই মনে করছেন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে, তবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে থাকা কেন্দ্রীয় অনুদানের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
প্রবীণ নাট্যব্যক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত মনে করেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে তা নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তবে তাঁর বক্তব্য, শুধুমাত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুললেই সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলার অসংখ্য নাট্যদল বহু বছর ধরে আর্থিক সংকটে ভুগছে। নিয়মিত অনুদান বন্ধ থাকায় অনেক দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, অনুদান ও প্রশিক্ষণ— দুটিকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অভিনেত্রী ও নাট্যপরিচালক পৌলমী বসুও মনে করেন, নতুন প্রজন্মের অভিনেতা ও পরিচালকদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উপকারী হতে পারে। তাঁর মতে, বাংলা নাট্যজগৎ একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর ক্ষেত্র হলেও, সেই মর্যাদা এখনও পুরোপুরি স্বীকৃতি পায়নি। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় অনুদান পুনরায় চালুর দাবিতে বহু নাট্যদল দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
অভিনেতা চন্দন সেনও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তাঁর বক্তব্যেও উঠে এসেছে অনুদানের বিষয়টি। তাঁর মতে, নাট্যচর্চার বাস্তব সমস্যার সমাধানে অর্থনৈতিক সহায়তা আরও বেশি জরুরি।
অন্যদিকে ‘চেতনা’ নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত সুজননীল মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন অনুদান না পাওয়ার ফলে তাঁদের দলকে স্বনির্ভর হওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। যদিও সম্প্রতি কিছু অনুদান মিলেছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তিনি মনে করেন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি চান, অনুদান বণ্টনের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা আনা হোক যাতে বঞ্চিত দলগুলিও কারণ জানতে পারে।
তবে সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া এসেছে অভিনেতা ও নাট্যপরিচালক কৌশিক সেনের কাছ থেকে। তাঁর অভিযোগ, বহু গ্রামীণ ও মফস্সলের নাট্যদলের অনুদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ঘোষণা বাস্তব সমস্যার সমাধান নয় বলেই তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, কলকাতার বাইরের বহু নাট্যদল শুধুমাত্র সরকারি অনুদানের উপর নির্ভর করেই টিকে আছে।
কৌশিক সেন আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নাট্যচর্চার স্বাধীনতা নিয়েও। তাঁর মতে, কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শ যদি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উপর প্রভাব বিস্তার করে, তবে ভবিষ্যতে কী ধরনের নাটক মঞ্চস্থ হবে তা নিয়েও নিয়ন্ত্রণ আসতে পারে। ফলে শিল্পের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, অমিত শাহের নাট্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরির ঘোষণা বাংলার নাট্যদুনিয়ায় নতুন আশার পাশাপাশি নতুন প্রশ্নও তুলে দিয়েছে। একাংশ মনে করছে, আধুনিক প্রশিক্ষণ ভবিষ্যতের শিল্পীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে অনেকেই মনে করছেন, আর্থিক অনুদান ছাড়া নাট্যদলগুলির অস্তিত্ব রক্ষা কঠিন। তাই বাংলার নাট্যসমাজ এখন অপেক্ষা করছে— ঘোষণার বাস্তব রূপ কতটা কার্যকর হয়, সেটাই দেখার।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.