মধ্যমগ্রামে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহকারী চন্দ্রনাথ রথ খুনের ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই উঠে আসছে সুপরিকল্পিত অপরাধচক্রের ইঙ্গিত। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, এই ঘটনায় ভিন্রাজ্যের কোনও অপরাধচক্র জড়িত কি না এবং হামলাকারীরা রাজ্যের বাইরে পালিয়েছে কি না।
বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামের দোহাড়িয়া এলাকায় নিজের আবাসনের কাছে গুলিবিদ্ধ হন চন্দ্রনাথ। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর গাড়ির চালক বুদ্ধদেব বেরাও গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর শরীর থেকে গুলি বের করা হয়েছে, তবে তিনি এখনও সঙ্কটজনক অবস্থায় আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের ধারণা, এই খুন তাৎক্ষণিক নয়, বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফল। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, ঘটনার প্রায় ছ’ঘণ্টা আগে থেকেই একটি চারচাকার গাড়ি এলাকায় ঘোরাফেরা করছিল। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, সন্দেহভাজনরা চন্দ্রনাথের বাড়ির আশপাশে রেকি চালাচ্ছিল। স্থানীয়দের দাবি, চন্দ্রনাথের যাতায়াতের কোনও নির্দিষ্ট সময়সূচি ছিল না। ফলে ওই রাতে তিনি কখন ওই এলাকায় থাকবেন, সেই নির্ভুল তথ্য আগে থেকেই খুনিদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল বলে মনে করছে পুলিশ।
ঘটনায় ব্যবহৃত একটি চারচাকার গাড়ি এবং একটি মোটরবাইক উদ্ধার হয়েছে। দু’টিতেই ভুয়ো নম্বরপ্লেট ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। উদ্ধার হওয়া বাইকটির রেজিস্ট্রেশন আসানসোলের বার্নপুরের এক ব্যক্তির নামে হলেও, সংশ্লিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে পুলিশ কাউকে খুঁজে পায়নি। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে অন্য ব্যক্তি বসবাস করছেন বলে জানা যায়। বাইকের নথিভুক্ত মালিকের ছবি নিয়ে স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদও শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, ব্যবহৃত গাড়িটির নম্বরপ্লেট ও শ্যাসি নম্বরও জাল বলে দাবি তদন্তকারীদের। গাড়িটির নম্বর শিলিগুড়ির এক ব্যক্তির গাড়ির সঙ্গে মিলে যায়। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে পারে, তাঁর আসল গাড়ি শিলিগুড়িতেই রয়েছে। ফলে স্পষ্ট হয়, অপরাধীরা তদন্তকে বিভ্রান্ত করতেই নকল নম্বরপ্লেট ব্যবহার করেছিল। এমনকি গাড়ির শ্যাসি নম্বরও ঘষে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল।
তদন্তে মোবাইল ফোনের তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঘটনার আগে ও পরে ওই এলাকায় কোন কোন ফোন সক্রিয় ছিল, তা জানতে ‘কল ডাম্প’ বা ‘টাওয়ার ডাম্প’ বিশ্লেষণ শুরু করেছে পুলিশ। নির্দিষ্ট সময়ে ওই এলাকার মোবাইল টাওয়ারে সংযুক্ত নম্বরগুলির তথ্য সংগ্রহ করে খুনিদের গতিবিধি বোঝার চেষ্টা চলছে।
এই মামলার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হয়েছে। রাজ্য পুলিশের পাশাপাশি এসটিএফ ও সিআইডির আধিকারিকেরাও তদন্তে যুক্ত হয়েছেন। একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীও মোতায়েন রয়েছে।
চন্দ্রনাথের মৃত্যু ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও তীব্র হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হওয়ার কারণেই চন্দ্রনাথকে খুন করা হয়েছে। তিনি এই হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত রাজনৈতিক হামলা বলে অভিযোগ করেছেন। বিজেপির আরও কয়েকজন নেতা শাসকদলের বিরুদ্ধে পরোক্ষ অভিযোগ তুলেছেন, যদিও পুলিশ এখনও পর্যন্ত সরকারি ভাবে কোনও রাজনৈতিক যোগের কথা ঘোষণা করেনি।
এদিকে, নিহতের মা হাসিরানি রথ আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, তিনি খুনিদের কঠোর শাস্তি চান, তবে মৃত্যুদণ্ড নয়। তাঁর দাবি, দোষীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়া উচিত। ছেলের মৃত্যুর বিচার চেয়ে তিনি নতুন সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
পুরো ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে মধ্যমগ্রাম এলাকায়। তদন্তকারীরা মনে করছেন, প্রযুক্তি ব্যবহার, ভুয়ো পরিচয়, পরিকল্পিত রেকি এবং নির্ভুল সময় বেছে নেওয়া— সব মিলিয়ে এটি অত্যন্ত সংগঠিত অপরাধের উদাহরণ হতে পারে। এখন নজর পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপ ও ফরেন্সিক রিপোর্টের দিকে।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than five years.