ওড়িশার উপকূলীয় শহর Puri বহু শতাব্দী ধরে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য পরিচিত। এই শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত বিখ্যাত Jagannath Temple। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষাকে ঘিরে আবারও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে এই প্রাচীন তীর্থস্থান। দাবি করা হচ্ছে, পুরীর মাটির নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে একটি প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ, এমনকি মন্দিরের নিচে সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত একটি সম্ভাব্য সুড়ঙ্গের অস্তিত্বের ইঙ্গিতও মিলেছে।
জিপিআর সমীক্ষায় চাঞ্চল্যকর ইঙ্গিত
মন্দির সংলগ্ন ‘শ্রীমন্দির পরিক্রমা প্রকল্প’ চলাকালীন কাজের সময় শ্রমিকরা একটি প্রাচীন সিংহমূর্তির সন্ধান পান। এই আবিষ্কারটি প্রত্নতত্ত্ববিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁদের প্রাথমিক অনুমান ছিল, মূর্তিটি শক্তিশালী Eastern Ganga dynasty-এর আমলের হতে পারে। এরপরই মাটির নিচে কী রয়েছে তা জানার জন্য গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার বা জিপিআর প্রযুক্তির সাহায্যে সমীক্ষা চালানো হয়।

জিপিআর এমন একটি আধুনিক প্রযুক্তি, যেখানে তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে মাটির গভীরে থাকা কাঠামো, ধাতব বা অধাতব বস্তু শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। এই সমীক্ষায় কিছু অস্বাভাবিক ভূগর্ভস্থ কাঠামোর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলেই দাবি করা হচ্ছে, যা গবেষকদের কৌতূহল বাড়িয়েছে।
শুধু মন্দির নয়, বিস্তৃত এলাকা জুড়ে সম্ভাব্য নিদর্শন
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শুধু মন্দিরের আশপাশেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং পুরো শহরজুড়েই এর বিস্তার থাকতে পারে। গবেষকদের দাবি, এমার মঠ, নৃসিংহ মন্দির, বুড়ি মা মন্দির এবং আশপাশের বিভিন্ন রাস্তা মিলিয়ে অন্তত ৪৩টি স্থানে প্রাচীন কাঠামো বা নিদর্শনের চিহ্ন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া মাটির নিচ থেকে প্রাচীন মৃৎপাত্র, ধাতব সামগ্রী এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা জিনিসের উপস্থিতির ইঙ্গিত মিলেছে। এসব আবিষ্কার থেকে ধারণা করা হচ্ছে, বহু আগে এখানে একটি উন্নত ও সংগঠিত জনবসতি ছিল।
প্রাচীন প্রাচীর ও বিশেষ কক্ষের সন্ধান
সমীক্ষা ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে একটি প্রায় ৩০ ফুট দীর্ঘ প্রাচীরের অস্তিত্বের কথা জানা গেছে, যা সম্ভবত গঙ্গা রাজবংশের সময়কার। পাশাপাশি প্রায় ৭.৬ মিটার দীর্ঘ এবং ৩ মিটার চওড়া একটি কক্ষেরও সন্ধান মিলেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিছু গবেষকের মতে, অতীতে এই স্থানে মূল্যবান বা স্বর্ণখচিত মূর্তির পূজা হত।

তবে এর আগে উদ্ধার হওয়া সিংহমূর্তিগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণে আরও সতর্কতার দাবি উঠেছে।
রিপোর্ট ঘিরে বিতর্ক
এই জিপিআর সমীক্ষা পরিচালনার জন্য প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে কাজটি করানো হয় Indian Institute of Technology Gandhinagar-কে দিয়ে। কিন্তু সমীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে পরে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। মন্দির প্রশাসনের দাবি, তারা ওই রিপোর্ট হাতে পায়নি। অন্যদিকে আইআইটি গান্ধীনগর জানায়, তারা যথাযথভাবে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে এক আইনজীবী তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে রিপোর্ট সংগ্রহ করেন এবং দ্রুত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খনন ও সংরক্ষণের দাবি তোলেন।
গঙ্গা রাজবংশ ও মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ইতিহাসবিদদের মতে, Eastern Ganga dynasty মধ্যযুগীয় ভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজবংশ। কলিঙ্গ অঞ্চলে তাঁদের শাসনকালে বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নির্মিত হয়। এর মধ্যে অন্যতম হল Jagannath Temple এবং বিখ্যাত Konark Sun Temple।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, গঙ্গা বংশের রাজা Anantavarman Chodaganga প্রায় ১১১২ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ শুরু করেন। পরবর্তী কয়েক দশকে মন্দিরের কাজ সম্পূর্ণ হয়। বেলেপাথরে নির্মিত এই মন্দির আজও হিন্দুধর্মের চার ধামের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত।
মন্দিরের কাঠামো ও ধর্মীয় গুরুত্ব
জগন্নাথ মন্দিরের চারটি প্রধান প্রবেশদ্বার রয়েছে—উত্তরে হস্তীদ্বার, দক্ষিণে অশ্বদ্বার, পশ্চিমে ব্যাঘ্র দ্বার এবং পূর্বে সিংহদ্বার। মন্দিরের অভ্যন্তরে একটি বিশেষ গোপন ভাণ্ডার রয়েছে, যা ‘রত্নভাণ্ডার’ নামে পরিচিত। সেখানে বহু মূল্যবান ঐতিহাসিক সম্পদ সংরক্ষিত আছে বলে মনে করা হয়।
এই মন্দিরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল বিখ্যাত Rath Yatra, যেখানে প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত সমবেত হন।
রহস্য, কিংবদন্তি এবং নতুন প্রশ্ন
পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে ঘিরে বহুদিন ধরেই নানা রহস্য ও লোককথা প্রচলিত আছে। যেমন—মন্দিরের চূড়ার পতাকা নাকি বাতাসের বিপরীত দিকে ওড়ে বা মন্দিরের ঠিক ওপর দিয়ে পাখি উড়ে না—এমন বিশ্বাস অনেকের মধ্যে রয়েছে, যদিও এগুলোর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সবসময় পাওয়া যায় না।
এবার মাটির নিচে সম্ভাব্য প্রাচীন নগরীর সন্ধানের দাবি সামনে আসায় নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দাবিগুলি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে হলে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক খনন, গবেষণা এবং সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পুরীর ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের আসল চিত্র এখনও সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সমীক্ষা ও আবিষ্কারের দাবি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার পথ খুলে দিতে পারে।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.