ধূমপান মানেই শুধু ফুসফুসের ক্ষতি— এমন ধারণা এখন আর সঠিক নয়। চিকিৎসক ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, সিগারেট বা তামাকজাত দ্রব্যের ক্ষতিকর প্রভাব ধীরে ধীরে শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গকে আক্রান্ত করতে পারে। দীর্ঘদিন ধূমপান করলে শুধু ফুসফুস নয়, অন্তত ১৫ ধরনের ক্যানসারের আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সিগারেটের ধোঁয়ায় ৭০টিরও বেশি ক্যানসার-সৃষ্টিকারী রাসায়নিক উপাদান থাকে। ধোঁয়া শরীরে প্রবেশ করার পর এই বিষাক্ত পদার্থ রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।
ধূমপানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে মুখ, জিভ, গলা, স্বরযন্ত্র, খাদ্যনালি, পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয়, লিভার, কিডনি, মূত্রথলি, কোলন, রেকটাম, জরায়ুমুখ, ডিম্বাশয় এবং নাক ও সাইনাসের ক্যানসারের। এছাড়াও রক্তের ক্যানসার অ্যাকিউট মাইলয়েড লিউকেমিয়ার ঝুঁকিও ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।
চিকিৎসকদের মতে, তামাক শুধু কোষের ক্ষতিই করে না, শরীরের স্বাভাবিক কোষ মেরামতির ক্ষমতাকেও দুর্বল করে দেয়। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ তৈরি হওয়ার ফলে শরীরে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়, যা ক্যানসার বৃদ্ধির পক্ষে অনুকূল।
মূত্রথলির ক্যানসারের ক্ষেত্রে ধূমপানের ভূমিকা অনেকের কাছেই অজানা। চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সিগারেটের বিষাক্ত রাসায়নিক কিডনির মাধ্যমে ছেঁকে প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে আসে। দীর্ঘদিন ধরে সেই রাসায়নিক মূত্রথলির ভেতরের আবরণে ক্ষতি করতে করতে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
ভারতে মুখ ও গলার ক্যানসারের ঝুঁকি আরও বেশি উদ্বেগের কারণ। কারণ ধূমপানের পাশাপাশি গুটখা, জর্দা ও অন্যান্য ধোঁয়াবিহীন তামাকও সমানভাবে ক্ষতিকর। এই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্তদের অনেক সময় কথা বলা, খাওয়া বা শ্বাস নিতে সমস্যার মুখে পড়তে হয়। অনেক রোগীকেই দীর্ঘ চিকিৎসা, রেডিয়েশন বা বড় অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন প্যাসিভ স্মোকিং বা পরোক্ষ ধূমপান নিয়েও। পরিবারের সদস্য, শিশু বা বয়স্করা নিয়মিত সিগারেটের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে তাঁদেরও ক্যানসার, হৃদরোগ ও ফুসফুসের অসুখের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে আশার দিকও রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, ধূমপান ছাড়ার পর থেকেই শরীর নিজেকে ধীরে ধীরে সুস্থ করার কাজ শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শরীরে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। সময়ের সঙ্গে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়ে, রক্তসঞ্চালন উন্নত হয় এবং ক্যানসারের ঝুঁকিও কমতে শুরু করে।
যদিও নিকোটিনের আসক্তি কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। তাই কাউন্সেলিং, নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকদের স্পষ্ট বার্তা, ধূমপান এখন আর শুধুমাত্র ফুসফুসের সমস্যা নয়— এটি গোটা শরীরের জন্য এক নীরব বিপদ। তাই ভবিষ্যতের প্রাণঘাতী ঝুঁকি এড়াতে যত দ্রুত সম্ভব তামাক ছাড়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।