বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় পশ্চিমবঙ্গের প্রজনন হার নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্যে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সন্তান নেওয়ার প্রবণতা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রবীণ জনসংখ্যার অনুপাত আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, একসময় বাঙালি পরিবারে দুই বা তার বেশি সন্তানের প্রবণতা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমানে গ্রাম ও শহর—উভয় ক্ষেত্রেই অধিকাংশ দম্পতি একটির বেশি সন্তান নিচ্ছেন না। আবার অনেক তরুণ দম্পতি প্রথম সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তও দীর্ঘদিন পিছিয়ে দিচ্ছেন বা নিচ্ছেনই না।
বিশেষজ্ঞদের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের মোট প্রজনন হার (Total Fertility Rate) কম। জাতীয় স্তরে গ্রামীণ অঞ্চলে যেখানে এই হার প্রায় ২.১, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ এলাকায় তা প্রায় ১.৭-এর কাছাকাছি। অর্থাৎ, জনসংখ্যা স্বাভাবিক হারে স্থিতিশীল রাখতে যে প্রজনন হার প্রয়োজন, রাজ্য তার নিচে অবস্থান করছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া বহু দম্পতি জানিয়েছেন, স্থায়ী আয়, চাকরির নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় তাঁরা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮৮ শতাংশ দম্পতি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগও এই প্রবণতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উচ্চশিক্ষা বা চাকরির জন্য রাজ্যের বহু তরুণ-তরুণী অন্য রাজ্য কিংবা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবার গঠন এবং সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গত দেড় দশকে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে তাঁদের পর্যবেক্ষণ।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বর্তমানে একটি শিশুকে বড় করে তোলা আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে অনেক দম্পতির কাছে মাতৃত্ব বা পিতৃত্ব এখন আবেগের পাশাপাশি বড় আর্থিক দায়বদ্ধতার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে এই চিত্র শুধু পশ্চিমবঙ্গের নয়। বিশ্বের বহু উন্নত দেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরেই প্রজনন হার নিম্নমুখী। নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কের মতো দেশেও জন্মহার প্রতিস্থাপন স্তরের নিচে নেমে এসেছে, যা জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রজনন হার কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু জনসংখ্যার সংখ্যা কমার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভবিষ্যতের শ্রমশক্তি, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রবীণদের দেখভালের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবারবান্ধব নীতির ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তাঁরা তুলে ধরেছেন।
Sumi has been waiting lifestyle, vastu Tips since 2026.