কিশোর কুমার—নামটাই যেন এক বিস্ময়। গায়ক, অভিনেতা, সুরকার এবং অনন্য রসবোধের অধিকারী এই কিংবদন্তি শিল্পী শুধু তাঁর অসাধারণ কণ্ঠের জন্যই জনপ্রিয় ছিলেন না, তাঁর খামখেয়ালি স্বভাব এবং অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানাও তাঁকে করে তুলেছিল অন্য সবার থেকে আলাদা। আজও তাঁর গান প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার কাছে সমান জনপ্রিয়। কিন্তু পর্দার আড়ালের কিশোর কুমার ছিলেন আরও বেশি রঙিন। কখনও অর্ধেক পারিশ্রমিক পেয়ে অর্ধেক মেকআপ করে শুটিংয়ে হাজির হয়েছেন, কখনও গাছের সঙ্গে গল্প করেছেন, আবার কখনও সাংবাদিককে খাঁচায় বন্দি করে মজা নিয়েছেন! ১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট জন্ম নেওয়া এই কিংবদন্তির জীবন থেকে এমনই কয়েকটি ঘটনা আজও লোকমুখে ঘোরে। চলুন জেনে নেওয়া যাক কিশোর কুমারের সেই ছয় ‘কাণ্ড’, যা তাঁর খামখেয়ালি স্বভাবের সাক্ষ্য দেয়।
অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতে কেন নিষিদ্ধ হয়েছিলেন কিশোর কুমার?
ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল কিশোর কুমারের। বড় ভাই অশোক কুমারের পরামর্শে অভিনয়ের জগতে প্রবেশ করলেও প্রথমদিকে সেই পথে খুব একটা সাফল্য পাননি। পরে ১৯৪৮ সালে ‘জিদ্দি’ ছবিতে প্লেব্যাক করার সুযোগ আসে। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় ১৯৬৯ সালে ‘আরাধনা’ ছবির ‘মেরে সপ্নো কি রানি’ গানটি জনপ্রিয় হওয়ার পর। রাজেশ খান্নার পর্দার উপস্থিতি এবং কিশোর কুমারের কণ্ঠ—এই জুটি দ্রুতই দর্শক-শ্রোতার কাছে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময় ঘটে অন্য ঘটনা। কেন্দ্রীয় সরকারের একটি অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কিশোর কুমার। এরপর তাঁর গান অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো ও দূরদর্শনে সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে জানা যায়। ফলে একটা সময় সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমে কার্যত নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে।
‘Beware of Kishore Kumar’—বাড়ির বাইরে এমন সাইনবোর্ড কেন?
কিশোর কুমারের মুম্বইয়ের বাড়ি ‘গৌরী কুঞ্জ’-কে ঘিরে রয়েছে একাধিক মজার গল্প। তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হল বাড়ির বাইরে ঝোলানো সেই সতর্কবার্তা—‘Beware of Kishore Kumar’। শোনা যায়, এক পরিচালক তাঁর বকেয়া পারিশ্রমিক মিটিয়ে কিশোর কুমারের সঙ্গে করমর্দন করতে গেলে তিনি আচমকাই তাঁর হাতে কামড়ে দেন! পরে নাকি মজা করে বলেন, বাড়ির বাইরে সতর্কবার্তা লেখা ছিল—সেটা আগে পড়া উচিত ছিল। আবার এক প্রযোজকের কাছ থেকে প্রায় ৮ হাজার টাকা বকেয়া পাওনা থাকায় তাঁর বাড়ির সামনে গিয়ে নাচতে নাচতে টাকা দাবি করেছিলেন বলেও নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে। কিশোর কুমারের কাছে পারিশ্রমিকের বিষয়টি যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা বোঝা যায় আরও কয়েকটি মজার ঘটনায়।
১. অর্ধেক টাকা, তাই অর্ধেক মেকআপ!
কিশোর কুমারের একটি বহুল আলোচিত নীতি ছিল—আগে পারিশ্রমিক, তারপর কাজ। একবার এক প্রযোজক তাঁকে পুরো পারিশ্রমিক না দিয়ে অর্ধেক টাকা দেন। শুটিংয়ের দিন কিশোর কুমারও হাজির হলেন এক অদ্ভুত সাজে—মুখের মাত্র এক পাশেই মেকআপ! প্রযোজক অবাক হয়ে কারণ জানতে চাইলে তাঁর জবাব ছিল, ‘অর্ধেক টাকা, তাই অর্ধেক মেকআপ!’ ঘটনাটি সত্যি হোক বা তাঁর খামখেয়ালি স্বভাবকে ঘিরে তৈরি জনপ্রিয় কাহিনি—কিশোর কুমারের রসবোধের সঙ্গে গল্পটি যেন পুরোপুরি মানানসই।
২. গাছের সঙ্গেই নাকি চলত তাঁর গল্প!
কিশোর কুমার যে প্রচলিত অর্থে খুব একটা ‘সাধারণ’ জীবনযাপন করতেন না, তাঁর আরও একটি উদাহরণ পাওয়া যায় গাছপালার প্রতি তাঁর ভালোবাসায়। শোনা যায়, নিজের বাগানের গাছগুলোর প্রত্যেকটির আলাদা নাম রেখেছিলেন তিনি। অবসর সময়ে সেই গাছগুলোর সঙ্গে গল্প করতেন, কথা বলতেন—যেন তারা তাঁর পরিবারেরই সদস্য। চকচকে পার্টি বা সামাজিক আড্ডার বদলে প্রকৃতির সান্নিধ্যেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন বলেও নানা স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।
৩. সাংবাদিককে খাঁচায় বন্দি করে দিয়েছিলেন!
সাক্ষাৎকার দিতে কিশোর কুমার যে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না, তা নিয়ে বহু গল্প রয়েছে। এমনই একটি মজার ঘটনা হল এক সাংবাদিককে ঘিরে। একবার এক সাংবাদিক তাঁর বাড়িতে সাক্ষাৎকার নিতে গেলে কিশোর কুমার তাঁকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রাখেন। এরপর একটি বড় খাঁচা এনে সাংবাদিকের মাথার ওপর চাপিয়ে দেন! তারপর নাকি বলেন, ‘খাঁচার ভেতরে থাকা প্রাণীদের কেমন লাগে, এবার বুঝতে পারবেন।’ কিশোর কুমারের অদ্ভুত রসবোধের উদাহরণ হিসেবে এই ঘটনাটি আজও আলোচিত।
৪. আলমারির ভেতর থেকেই পরিচালকের সঙ্গে বৈঠক!
সিনেমার প্রস্তাব নিয়ে বাড়িতে এসেছিলেন এক পরিচালক। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পর হঠাৎ তিনি কিশোর কুমারের গলা শুনতে পান—কিন্তু মানুষটি কোথায়? শেষে জানা যায়, কিশোর কুমার নাকি আলমারির ভেতরে বসেই পরিচালকের সঙ্গে কথা বলছেন! সেখান থেকেই তিনি সিনেমার প্রস্তাব, স্ক্রিপ্ট এবং পারিশ্রমিক নিয়ে আলোচনা করেছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে। সাধারণ মানুষ যেখানে বসার ঘরে বসে মিটিং করেন, কিশোর কুমারের কাছে সেই বৈঠকও হয়ে উঠেছিল একেবারে অন্যরকম!
৫. বাড়ির দেওয়ালে কঙ্কাল ঝুলিয়ে অতিথিদের ভয় দেখাতেন
কিশোর কুমারের বাড়ির সাজসজ্জাও নাকি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের মতোই বিচিত্র।শোনা যায়, বাড়ির বসার ঘরে কঙ্কাল ও মানুষের খুলির প্রতিরূপ সাজিয়ে রাখতেন তিনি। নতুন অতিথি বা প্রযোজক বাড়িতে এলে কখনও কখনও ঘরের আলো নিভিয়ে সেই অদ্ভুত সাজসজ্জা দিয়ে তাঁদের ভয় দেখাতেন। অতিথিরা যখন চমকে উঠতেন, তখন সেটাই নাকি হয়ে উঠত তাঁর কাছে সবচেয়ে মজার মুহূর্ত।
৬. নিজের মৃত্যুকেও রসিকতার বিষয় বানিয়েছিলেন!
কিশোর কুমারের রসবোধ যে কতটা তীক্ষ্ণ ছিল, তা তাঁর মৃত্যুচিন্তা নিয়েও করা রসিকতার গল্প থেকে বোঝা যায়। বন্ধুদের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি নাকি একবার বলেছিলেন, তিনি মারা গেলে কেউ যেন কাঁদাকাটি না করে। বরং সবাই তাঁর চারপাশে দাঁড়িয়ে হইচই করবে, এমনকি পপকর্ন খাবে! মৃত্যুর মতো গুরুতর বিষয় নিয়েও এমন অদ্ভুত ও হালকা রসিকতা করার ক্ষমতা তাঁর ব্যক্তিত্বেরই একটি বিশেষ দিক।
শুধু গায়ক নন, কিশোর কুমার ছিলেন একেবারেই আলাদা
কিশোর কুমারের জীবন ছিল তাঁর গানের মতোই বৈচিত্র্যময়। গায়ক হিসেবে তাঁর কণ্ঠ কোটি শ্রোতাকে মুগ্ধ করেছে। অভিনেতা হিসেবে তিনি তৈরি করেছেন একের পর এক স্মরণীয় চরিত্র। সুরকার হিসেবেও রেখে গিয়েছেন নিজের ছাপ। কিন্তু এর পাশাপাশি তাঁর খামখেয়ালি স্বভাব, অদ্ভুত রসবোধ এবং নিজের শর্তে জীবন কাটানোর গল্পও তাঁকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।
তাঁকে ঘিরে প্রচলিত এই ঘটনাগুলোর কিছু হয়তো সময়ের সঙ্গে আরও রঙিন হয়ে লোককথার রূপ পেয়েছে। তবু একটা বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—কিশোর কুমার ছিলেন ভারতীয় বিনোদন জগতের এমন এক চরিত্র, যাঁকে অন্য কারও সঙ্গে মেলানো কঠিন। তাঁর গান আজও অমলিন। আর তাঁর ‘খ্যাপাটে’ স্বভাবের গল্পগুলোও অনুরাগীদের মনে তাঁকে আরও আপন করে রেখেছে।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.