জ়ুবিন গর্গের চলে যাওয়ার এক বছর। এখনও তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ মেনে নিতে পারছেন না তাঁর অনুরাগী থেকে সহকর্মীরা। গান ও সৃষ্টির পাশাপাশি তাঁর মানবিকতার নানা গল্পও বার বার উঠে আসছে। তেমনই এক স্মৃতি ভাগ করে নিলেন এক সহশিল্পী। জ়ুবিনের মুম্বইয়ের বাড়িতে গিয়ে তাঁর এমন এক রূপ দেখেছিলেন তিনি, যা আজও তাঁর মনে গেঁথে রয়েছে।
‘মন মানে না’, ‘সোনিয়ে তু’-র মতো গানে জ়ুবিনের সঙ্গে কাজ করেছিলেন ওই শিল্পী। তবে তাঁদের ব্যক্তিগত আলাপ হয়েছিল আরও পরে। জ়ুবিনের একটি গান রেকর্ড করতে মুম্বইয়ের আন্ধেরিতে তাঁর স্টুডিয়োয় গিয়েছিলেন তিনি। সেখানেই জ়ুবিনের জীবনের এক অন্য ছবি দেখেছিলেন।
আন্ধেরিতে বাংলো ধাঁচের বাড়িতেই ছিল জ়ুবিনের স্টুডিয়ো। সেখানে গিয়ে ওই শিল্পী দেখেন, বাড়িতে অনেক অপরিচিত মানুষের আনাগোনা। বিষয়টি দেখে তিনি জ়ুবিনকে প্রশ্ন করেন, “এরা কারা?” জ়ুবিনের উত্তর শুনে কার্যত অবাক হয়ে যান তিনি। জ়ুবিন জানান, ওই মানুষগুলির থাকার জায়গা নেই। কেউ কাজের সন্ধানে অসম থেকে মুম্বই এসেছেন, কারও আবার হাতে টাকা নেই। তাই তাঁর বাড়িতেই থাকেন তাঁরা। শুধু আশ্রয় দেওয়াই নয়, তাঁদের থাকা-খাওয়ার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন জ়ুবিন। তাঁর বাড়িতে যেন তৈরি হয়েছিল এক ‘অসম গেস্টহাউস’। শিল্পীর কথায়, জ়ুবিনের এই মানবিক দিকটি অনেকেরই অজানা ছিল।
সেই দিনের আরও একটি ঘটনা আজও মনে রয়েছে ওই শিল্পীর। জ়ুবিনের বাড়িতে সেদিন অসমের নানা ধরনের রান্না হচ্ছিল। মাছ-মাংস-সহ ছিল নানা পদ। অনেকটা পিকনিকের মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তাঁকে খেয়ে যেতে বলেছিলেন জ়ুবিন। কিন্তু পরের দিন ভোরে বিমান ধরার কথা থাকায় তিনি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এর মধ্যেই হঠাৎ জ়ুবিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। সঙ্গে নিয়ে যান ওই শিল্পীর গাড়ির চাবিও। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফোন করা হলে দেখা যায়, জ়ুবিনের ফোনও বন্ধ। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁর সহকারীদের সঙ্গে সময় কাটাতে হয়। রাত বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত খাবার খেতেই হয় তাঁকে।
রাত প্রায় একটা নাগাদ জ়ুবিন বাড়ি ফেরেন। ফিরেই প্রথম প্রশ্ন করেন, “খেয়েছ তো?” তখনই ওই শিল্পীর কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। তাঁকে না খাইয়ে যেন কোনও ভাবেই ছাড়বেন না জ়ুবিন। তাই ইচ্ছা করেই এমন কাণ্ড করেছিলেন তিনি।ওই শিল্পীর কথায়, জ়ুবিন ছিলেন অত্যন্ত শিশুসুলভ এবং সরল মনের মানুষ। কোনও জটিলতা ছিল না তাঁর মধ্যে। গানকে ঘিরে থাকতেন, পাশাপাশি মানুষের জন্যও কাজ করতেন। তাঁর আন্ধেরির বাড়ির ঘটনাটি ছিল এমন অসংখ্য ঘটনার মধ্যে মাত্র একটি।
জ়ুবিনের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে ওই শিল্পীর। একই অনুষ্ঠানে দু’জনকে পর পর গান গাইতে হলে আগে থেকেই আলোচনা করে নিতেন তাঁরা—কে কোন গান গাইবেন, যাতে একই গান না হয়ে যায়। বয়সে অনেকটাই ছোট সহশিল্পীর সঙ্গে সব সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন জ়ুবিন।
মুম্বই নিয়ে জ়ুবিনের নিজের একটি মন্তব্যও মনে পড়েছে ওই শিল্পীর। তাঁকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, কেন তিনি মুম্বইয়ে স্থায়ী ভাবে থাকেন না। জ়ুবিনের উত্তর ছিল, “আমার বম্বে ভাল লাগে না। অসমে তো আমি রাজার মতো থাকি।”তখন হয়তো কথাটিকে কিছুটা বাড়াবাড়ি বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে বুঝেছেন, জ়ুবিন একেবারেই ভুল বলেননি। অসমের মানুষের সঙ্গে তাঁর যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা ছিল শিল্পীর পরিচয়ের বাইরেও অনেক গভীর।
তাই জ়ুবিনের প্রয়াণের পর অসমজুড়ে যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছিল, তার কারণ শুধু তাঁর অসাধারণ গান নয়। মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নিজের বাড়ির দরজা অচেনা মানুষের জন্য খুলে দেওয়া এবং সহজ-সরল ভাবে বেঁচে থাকার সেই স্বভাবই তাঁকে মানুষের এতটা কাছের করে তুলেছিল।
জ়ুবিনের মৃত্যুর ঘটনাও এখনও অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য। ব্রহ্মপুত্রের মতো নদীতে অনায়াসে সাঁতার কাটতে পারা মানুষটির এমন পরিণতি কী ভাবে হল, সেই প্রশ্নও রয়ে গিয়েছে। তবে তাঁর গান যেমন থেকে যাবে, তেমনই থেকে যাবে তাঁর মানবিকতার অসংখ্য গল্প। অসমের মানুষের কাছে তিনি হয়তো সত্যিই ‘রাজা’ হয়েই থেকে যাবেন।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.
