বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের এক অনন্য মেলবন্ধনের সাক্ষী থাকল সাম্প্রতিক এক বিশেষ আয়োজন। বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালক ও বাদ্যযন্ত্রী দেবজ্যোতি মিশ্র শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-কে, সম্পূর্ণ নতুন একটি রাগ সৃষ্টি করে—যার নাম দিয়েছেন ‘রাগ বিভূতি’।
গ্রামবাংলার প্রকৃতি, সরল জীবনযাপন ও আবেগঘন মানবিক সম্পর্ক—এই সবই বিভূতিভূষণের লেখার প্রধান শক্তি। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস পথের পাঁচালী-তে অপু ও দুর্গার মাধ্যমে যে জীবনচিত্র ফুটে ওঠে, সেই অনুভূতিকেই সুরের মাধ্যমে নতুনভাবে প্রকাশ করেছেন দেবজ্যোতি।
নতুন রাগের বৈশিষ্ট্য
‘রাগ বিভূতি’ একটি মিশ্র রাগ, যেখানে আরোহণে রাগ দুর্গার সুরভঙ্গি এবং অবরোহণে রাগ ভৈরবীর আবহ মিশে গেছে। এই সুররচনায় গ্রামবাংলার মাটির গন্ধ, প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ও একধরনের নস্টালজিয়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুধু রাগ সৃষ্টিতেই থেমে থাকেননি তিনি—সাত মাত্রার তালে একটি বন্দিশও তৈরি করেছেন, যা অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়।
বিশেষ অনুষ্ঠান ও পরিবেশনা
গত ১৯ এপ্রিল ২০২৬, কেসিসি বৈঠকখানার অ্যাম্পিথিয়েটারে অনুষ্ঠিত হয় এই বিশেষ অনুষ্ঠান। ‘অপুর বাজনা’ শিরোনামের এই পরিবেশনায় উঠে আসে সত্যজিৎ রায়-এর অমর ‘অপু ট্রিলজি’—যার অন্তর্ভুক্ত পথের পাঁচালী, অপরাজিত এবং অপুর সংসার।
এই চলচ্চিত্রগুলির আবহসঙ্গীত নির্মাণ করেছিলেন কিংবদন্তি পণ্ডিত রবি শঙ্কর, যার সুর আজও দর্শক-শ্রোতাদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। সেই ঐতিহ্যকেই সম্মান জানিয়ে এই অনুষ্ঠানে একের পর এক সুরের মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে ওঠে অপু-দুর্গার শৈশব, বৃষ্টিভেজা দৃশ্য, এবং পরিবারের আবেগঘন মুহূর্ত।

শিল্পীদের অংশগ্রহণ
অনুষ্ঠানে অংশ নেন একাধিক প্রতিভাবান শিল্পী। সরোদে মৈশিলী, বাঁশিতে সৌম্যজ্যোতি, এস্রাজ ও তার সানাইয়ে দেবায়ন, সেতারে সুভাষ এবং ভাইব্রোফোনে সুদীপ্ত সুরের আবহ তৈরি করেন। কণ্ঠসংগীতে ছিলেন সোনাক্ষী ও অরিত্র।
বিশেষ আকর্ষণ ছিল আলোক নাথ দে-র নাতি হাম্পটু-র পরিবেশিত ‘পথের পাঁচালী’-র বাঁশির সুর, যা দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।

শিল্পীর অনুভূতি
অনুষ্ঠান শেষে দেবজ্যোতি মিশ্র জানান, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মরণে ‘রাগ বিভূতি’ সৃষ্টি করতে পেরে তিনি গর্বিত ও আনন্দিত। তাঁর নিজের সৃষ্ট বন্দিশ এই রাগে পরিবেশিত হওয়াও তাঁর কাছে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা।
এই আয়োজন যেন শুধু একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান নয়—বরং বাংলা সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও সংগীতের ঐতিহ্যকে একসূত্রে বেঁধে রাখার এক আবেগঘন প্রয়াস।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than four years.