‘পায়েসের সঙ্গে সাপতা লুচি খেত রাহুল’, জন্মদিনে ছেলের স্মৃতিতে আবেগপ্রবণ মা শ্যামলী

টালিগঞ্জের অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরে কেটে গিয়েছে বেশ কয়েক মাস। কিন্তু ছেলেকে হারানোর শোক আজও ভুলতে পারেননি তাঁর মা শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, প্রয়াত অভিনেতার জন্মদিনে পুরনো স্মৃতি আঁকড়েই দিন কাটছে তাঁর। ছেলের পছন্দের খাবার থেকে জন্মদিনের আয়োজন, সবই যেন বার বার ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অতীতে।

ক্যালেন্ডারের পাতায় আরও একটি ১৬ অক্টোবর। কিন্তু বিজয়গড়ের ‘অনন্যা অ্যাপার্টমেন্ট’-এর একটি ফ্ল্যাটে আজ আর জন্মদিনের কোনও আনন্দ নেই। যে বাড়িতে একসময় বন্ধুদের আড্ডা, হাসি-গল্প আর হইহুল্লোড়ে মুখর থাকত পরিবেশ, সেখানে এখন শুধুই শূন্যতা। কারণ, এ বছর আর জন্মদিনে বাড়ি ফিরবেন না অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মৃত্যুর পরে এটাই প্রথম জন্মদিন। গত ২৯ মার্চ সমুদ্রের ধারে শুটিং করতে গিয়ে মৃত্যু হয় ৪২ বছর বয়সি অভিনেতার। সেই ঘটনা ঘিরে তোলপাড় হয়েছিল রাজ্য। অভিনেতার মৃত্যুর তদন্তের দাবিতে সরব হয়েছিলেন ইন্ডাস্ট্রির একাংশ। সময়ের নিয়মে কাজের জগতে ফিরেছেন অনেকে। কিন্তু রাহুলের পরিবারের কাছে সেই ক্ষত আজও দগদগে। বিশেষ করে ছেলেকে হারিয়ে একাকিত্বের সঙ্গে লড়াই করছেন তাঁর মা শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাহুলের মৃত্যুর পরে সংবাদমাধ্যমের সামনে খুব একটা মুখ খোলেননি তাঁর মা। তবে ঘনিষ্ঠদের কাছে মাঝেমধ্যে ছেলের কথা বলে নিজের মন হালকা করার চেষ্টা করেন তিনি। জন্মদিনের দিনও স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছিলেন শ্যামলী। ছেলের কথা উঠতেই চোখে জল এসে যায় তাঁর। আবেগ সামলে বলেন, ‘‘কেমন আর থাকতে পারি? ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছি।’’

বাড়ির একদিকে সাজানো রয়েছে রাহুল, তাঁর অভিনেত্রী স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার এবং তাঁদের একমাত্র ছেলে সহজের ছবি। রয়েছে বিভিন্ন কুইজ় প্রতিযোগিতায় জেতা পুরস্কার, বই এবং রাহুলের আঁকা ছবি। একসময় যে ঘরে বসে কাজ করতেন অভিনেতা, সেই ঘরের প্রতিটি জিনিসই এখন মায়ের কাছে অমূল্য সম্পদ। রাহুলের ঘরে রয়েছে তাঁর পডকাস্ট ‘সহজ কথা’-র কাজের স্মৃতি। সারি সারি বইয়ের তাক যেন মনে করিয়ে দেয়, বইয়ের প্রতি কতটা টান ছিল অভিনেতার। জন্মদিনের দিনেও এই ঘরেই সময় কাটাতে ভালবাসতেন তিনি। ছেলের পুরনো জন্মদিনের কথা মনে করে শ্যামলী জানান, গত বছর আচমকাই অনেক বন্ধুকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন রাহুল। মাকে বলেছিলেন, বন্ধুরা আসবেন, তাঁদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সেদিন গোটা বাড়ি আনন্দে মেতে উঠেছিল। অথচ এ বছর সেই চেনা ছবিটাই সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে।

জন্মদিন মানেই রাহুলের জন্য বিশেষ আয়োজন। ছেলের পছন্দের খাবার নিজে হাতে তৈরি করতেন মা। সেই প্রসঙ্গ উঠতেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন শ্যামলী। তিনি জানান, প্রতি বছর জন্মদিনে রাহুলের জন্য পায়েস তৈরি করতেন। আশীর্বাদের সময় সেই পায়েস দেওয়া হত। তবে শুধু পায়েস নয়, তার সঙ্গে চাই ছিল বিশেষ ধরনের লুচি। মায়ের কথায়, ‘‘পায়েস হত, আশীর্বাদে দিতাম। সেটা আবার লুচি দিয়ে খেত। তবে এমনি লুচি নয়, সাপতা লুচি করে দিতে হত।’’ ছোটবেলা থেকেই এই লুচির প্রতি বিশেষ দুর্বলতা ছিল রাহুলের। কেন এমন লুচি খেতে ভালবাসতেন, সেই প্রশ্নের উত্তরে নাকি অভিনেতা বলতেন, সত্যজিৎ রায় এই ধরনের লুচি খেতেন। ময়ান ছাড়া তৈরি লুচিই ছিল তাঁর পছন্দ। ময়ান দেওয়া লুচি একেবারেই ভাল লাগত না তাঁর। শুধু জন্মদিনের বিশেষ পদ নয়, বাড়ির সাধারণ খাবারও খুব ভালবাসতেন রাহুল। শুটিং কিংবা কোনও অনুষ্ঠান থেকে যত রাতেই ফিরুন না কেন, বাড়িতে ফিরে খাওয়াদাওয়া করতেই পছন্দ করতেন তিনি। কখনও আবার নিজের হাতে নারকেলের পায়েস বানানোর পরিকল্পনাও করতেন।

গত বছরের জন্মদিনের স্মৃতিও আজও স্পষ্ট শ্যামলীর মনে। তাঁর কথায়, জন্মদিনে প্রিয়াঙ্কা ও সহজ বাড়িতে এসেছিলেন। প্রিয়াঙ্কা নিজে হাতে খাবার গুছিয়ে দিয়েছিলেন। পরদিন সহজের স্কুল থাকায় তাঁরা আগেই বেরিয়ে যান। রাতে বাড়িতে ছিলেন মা ও ছেলে। সেই রাতের কথাই মনে পড়ে যায় শ্যামলীর। তিনি জানান, খাওয়াদাওয়ার আগে রাহুল তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি খুব ক্লান্ত কি না। তার পরে দু’জনে একসঙ্গে খেয়েছিলেন। খাওয়ার পরে মায়ের কাছ থেকে আদরও নিয়েছিলেন অভিনেতা। মায়ের কথায়, রাহুল বড় হয়েও ছোটদের মতো আদর খেতে ভালবাসতেন। সেই স্মৃতি মনে পড়তেই যেন আরও একবার শূন্যতা গ্রাস করে তাঁকে। আক্ষেপের সুরে বলেন, এ বছর আর ছেলেকে আদর করার সুযোগ নেই। তাঁর কথায়, ‘‘আর এ বার আমার কোল শূন্য!’’

অভিনয়ের পাশাপাশি কুইজ়, বই পড়া এবং লেখালিখির প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল রাহুলের। তাঁর ঘরে সাজানো অসংখ্য বইয়ের দিকে তাকালেই সেই ভালবাসার পরিচয় পাওয়া যায়। কুইজ় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পছন্দ করতেন অভিনেতা। কোনও প্রতিযোগিতায় জিততে না পারলে মন খারাপ হয়ে যেত তাঁর। বইয়ের প্রতি রাহুলের টান কতটা গভীর ছিল, তা বোঝাতে গিয়ে শ্যামলী জানান, কেউ তাঁকে ১০০ টাকা দিলেও সেই টাকা দিয়ে বই কিনে ফেলতেন ছেলে। বাড়ি ফিরে আর দেরি করতেন না, সঙ্গে সঙ্গেই পড়তে বসে যেতেন। ছেলের লেখার প্রতিও ছিল মায়ের বিশেষ টান। রাহুল নিজের লেখা মাকে পড়তে দিতেন। মা না পড়লে অভিমানও করতেন। ছেলের জীবনে নিজের গুরুত্বের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন শ্যামলী। তাঁর কাছে রাহুলের রেখে যাওয়া বই, লেখা এবং পুরস্কার এখন স্মৃতির অমূল্য সম্পদ। রাহুলের স্বভাবের কথাও বার বার উঠে আসে মায়ের কথায়। পরিচিত-অপরিচিত সবার সঙ্গে সহজেই মিশে যেতে পারতেন অভিনেতা। সবজি বিক্রেতা থেকে রিকশাচালক, প্রত্যেকের সঙ্গেই আন্তরিকভাবে কথা বলতেন। বয়স কিংবা পেশা দেখে কাউকে আলাদা করে দেখতেন না। মানুষের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলার এই গুণই তাঁকে অনেকের কাছে প্রিয় করে তুলেছিল বলে মনে করেন তাঁর মা।

বাড়ির আর এক সদস্য রাহুলের প্রিয় পোষ্য কুট্টুস। অভিনেতার মৃত্যুর পরেও যেন সে অপেক্ষায় থাকে তার প্রিয় মানুষটির জন্য। গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পেলেই ছুটে আসে কুট্টুস। হয়তো ভাবে, এবার বাড়ি ফিরেছেন তার বাবিন। শ্যামলী জানান, সহজ যখনই বাড়িতে আসে এবং বাবার ঘরে ঢোকে, কুট্টুসও সেখানে গিয়ে বসে থাকে। যেন তারও মনে হয়, রাহুল বুঝি ফিরে এসেছেন। ছেলের মৃত্যুর পরে প্রিয় পোষ্যটির এই আচরণও মায়ের কষ্ট বাড়িয়ে দেয়। যে মানুষটিকে ঘিরে বাড়ির এত আনন্দ ছিল, তাঁর অনুপস্থিতি এখন প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করেন শ্যামলী। রাহুলের মৃত্যুর পরে তাঁর স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার এবং ছেলে সহজকেও সামলাতে হচ্ছে নতুন বাস্তবতা। শ্যামলীর কথায়, সহজ এখন বাড়িতে এলে বাবার ঘরে গিয়ে বসে থাকে। নাতির জন্য খাবার তৈরি করেন তিনি। অনেক সময় রাহুলের পছন্দের খাবারই বানিয়ে দেন। তবে সহজ বাবাকে নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করে না। বরং রাহুলের নানা মজার কাণ্ডকারখানার কথা প্রিয়াঙ্কা ও শ্যামলীর মধ্যে উঠে আসে। সেই সব কথা বলতে বলতে মন খারাপ হয়ে যায় দু’জনেরই।

নাতি ও পুত্রবধূর কষ্টের কথাও উপলব্ধি করেন শ্যামলী। তাঁর মতে, সহজকে বড় করে তোলার দায়িত্ব প্রিয়াঙ্কার উপরেই সবচেয়ে বেশি। তাই নিজের শোকের পাশাপাশি তাঁদের কষ্টের কথাও ভাবেন তিনি। এ বার ছোট ছেলেকে ছাড়া প্রথম পুজো কাটাতে হবে শ্যামলীকে। প্রতি বছর পরিবারের সঙ্গে কেনাকাটা করতে যেতেন রাহুল। মায়ের জন্য শাড়িও পছন্দ করে দিতেন। ঘরে রাখা সেই শাড়ির দিকে তাকালেও ফিরে আসে ছেলের স্মৃতি। শ্যামলীর কথায়, রাহুলের সঙ্গে থাকলে প্রতিটি দিনই আনন্দে কাটত। কখনও রান্না, কখনও আড্ডা, কখনও আবার বই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া—ছেলের প্রতিটি অভ্যাসই আজ তাঁকে মনে করিয়ে দেয় হারিয়ে যাওয়া দিনগুলির কথা।

জন্মদিনে যে বাড়ি একসময় বন্ধুদের হাসি-আড্ডায় ভরে উঠত, সেখানে আজ নীরবতা। ছেলের স্মৃতি, বই, ছবি আর প্রিয় পোষ্যকে নিয়েই দিন কাটছে শ্যামলীর। তবু মনের গভীরে একটি প্রশ্ন বার বার ফিরে আসে। যে ছেলে হাসিমুখে শুটিংয়ে বেরিয়েছিল, সে আর কোনও দিন বাড়ি ফিরবে না—এই সত্য মেনে নেওয়া কি আদৌ সম্ভব?

রাহুলের প্রথম জন্মদিনে ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাই বার বার চোখ ভিজে উঠছে পুত্রহারা মায়ের। সময় এগিয়ে চলেছে, কিন্তু শ্যামলীর কাছে যেন থমকে রয়েছে সেই দিনটি, যেদিন চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর আদরের বাবিন।

শুধু হজম শক্তি বাড়িয়ে দেয় না, জোয়ান খেলে শরীরের অনেক সমস্যা নিবারণ হয় মুখরোচক বাদাম চিক্কি খেতে দারুন, বাড়িতেই তৈরী হবে, জানুন রেসিপি এইভাবে তেজপাতা পোড়ালে দুশ্চিন্তা কেটে যাবে 5 Best Night Creams ৪ মাসের শিশু ২৪০ কোটির মালিক