একসময় হৃদরোগকে বয়সজনিত সমস্যা বলেই মনে করা হত। ধারণা ছিল, নির্দিষ্ট বয়সের পরেই হার্টের অসুখ দেখা দেয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও বাড়ছে হার্ট অ্যাটাক, উচ্চ রক্তচাপ ও বিভিন্ন জটিল হৃদরোগের প্রবণতা। চিকিৎসকদের মতে, আধুনিক জীবনযাপন, মানসিক চাপ, নেশা এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসই এই পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী।
বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক জীবনে কাজের চাপ, অনিশ্চয়তা এবং সফল হওয়ার দৌড়ে অনেকেই মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। দীর্ঘদিনের স্ট্রেস শরীরে নানাভাবে প্রভাব ফেলে। অনেকেই সেই চাপ সামলাতে ধূমপান, তামাক বা অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এই অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করে এবং রক্তনালিতে সমস্যা তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপান হৃদরোগের অন্যতম বড় কারণ। শুধু সক্রিয় ধূমপায়ীই নন, পরোক্ষ ধোঁয়ার সংস্পর্শেও হার্টের ক্ষতি হতে পারে। একইভাবে পানমশলা বা অন্যান্য তামাকজাত দ্রব্যও সমানভাবে বিপজ্জনক। এগুলো রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।
পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলেও সতর্ক হওয়া জরুরি। বংশগত কারণে অনেকের শরীরে অল্প বয়স থেকেই কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ফলে ধমনিতে ব্লক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে, যা ভবিষ্যতে মারাত্মক হৃদরোগ ডেকে আনতে পারে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে শারীরিক পরিশ্রম অনেকটাই কমে গিয়েছে। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, নিয়মিত শরীরচর্চার অভাব এবং ফাস্ট ফুড খাওয়ার প্রবণতা থেকে বাড়ছে স্থূলতা ও ডায়াবেটিস। এই দুই সমস্যাই হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হরমোন থেরাপি বা কিছু ওষুধ ব্যবহার করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে থাইরয়েডের সমস্যা, যেমন হাইপারথাইরয়েডিজম, হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে হার্টের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং জটিলতা তৈরি হতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপও নীরব ঘাতকের মতো কাজ করে। এটি শুধু হার্ট অ্যাটাক নয়, সেরিব্রাল স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের মতে, মুখের স্বাস্থ্য অবহেলা করলেও বিপদ হতে পারে। দাঁত ও মাড়ির সংক্রমণ বা ওরাল ক্যাভিটির সমস্যা থেকেও শরীরে প্রদাহ তৈরি হতে পারে, যা হৃদরোগের কারণ হতে পারে। এমন বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অন্যান্য শারীরিক মানদণ্ড স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও মুখগহ্বরের সংক্রমণ থেকে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এছাড়া শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন থাকলেও হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়ে। তাই যেকোনও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যাকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা করানো প্রয়োজন।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার, ডিপ ফ্রাই বা একই তেলে বারবার ভাজা খাবার হার্টের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কারণ বারবার গরম করা তেলে ট্রান্সফ্যাট তৈরি হয়, যা রক্তনালিতে ক্ষতি করে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, খাদ্যতালিকায় বেশি করে ফল, শাকসবজি, গোটা শস্য এবং ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার রাখার। অতিরিক্ত চিনি, ময়দা ও প্রসেসড খাবার এড়িয়ে চলাও প্রয়োজন।
সুস্থ থাকতে শুধু ওষুধ নয়, জীবনযাপনের পরিবর্তনও জরুরি। নিয়মিত হাঁটা, শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন অন্তত ৪-৫ কিলোমিটার হাঁটা বা প্রায় ১০ হাজার স্টেপ সম্পূর্ণ করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
একই সঙ্গে মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান, মেডিটেশন বা পছন্দের কাজের মধ্যে সময় কাটানোও উপকারী। সব ধরনের নেশা থেকে দূরে থাকা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোই কম বয়সে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।

Hello, I am BB. I have been working in blogging for more than five years.