সন্তান জন্ম একটি নারীর জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোর একটি। তবে মাতৃত্বের এই নতুন অধ্যায়ের সঙ্গে শরীর ও মনের ওপর নেমে আসে বড় ধরনের পরিবর্তন। পরিবারের সবাই যখন নবজাতককে ঘিরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন অনেক সময় নতুন মায়ের শারীরিক ও মানসিক সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যায়। অথচ চিকিৎসকদের মতে, প্রসবের পরের প্রথম কয়েক সপ্তাহ একজন মায়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব, রক্তক্ষরণ, হরমোনের ওঠানামা, ঘুমের অভাব এবং নতুন দায়িত্বের চাপ—সব মিলিয়ে এই সময় নারীর শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই প্রসবের পর অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অস্বাভাবিক কোনও পরিবর্তনকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কিছু লক্ষণ হতে পারে গুরুতর জটিলতার পূর্বাভাস।
মানসিক পরিবর্তন ও বিষণ্নতা
সন্তান জন্মের পর অনেক মা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। অকারণে কান্না পাওয়া, মন খারাপ থাকা বা উদ্বেগ তৈরি হওয়া শুরুতে স্বাভাবিক মনে হলেও, তা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সতর্ক হতে হবে। অতিরিক্ত হতাশা, খিটখিটে মেজাজ, ঘুমের সমস্যা, কোনও কিছুতে আগ্রহ না থাকা কিংবা শিশুর সঙ্গে মানসিক দূরত্ব তৈরি হওয়া পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের লক্ষণ হতে পারে। এ সময় পরিবারের সহানুভূতি ও চিকিৎসকের পরামর্শ খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণে সমস্যা
গর্ভাবস্থা ও স্বাভাবিক প্রসবের কারণে পেলভিক ফ্লোরের পেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এর ফলে হাঁচি, কাশি বা হাসির সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রস্রাব বের হয়ে যেতে পারে। অনেক নারী লজ্জার কারণে বিষয়টি গোপন রাখেন। কিন্তু নিয়মিত ব্যায়াম, পেলভিক ফ্লোর থেরাপি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে এ সমস্যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সেলাই বা অস্ত্রোপচারের স্থানে ব্যথা
প্রসবের পর কিছুটা ব্যথা স্বাভাবিক হলেও, সেলাইয়ের জায়গা অতিরিক্ত ফুলে যাওয়া, লাল হয়ে যাওয়া, দুর্গন্ধ তৈরি হওয়া বা জ্বর আসা সংক্রমণের ইঙ্গিত দিতে পারে। বিশেষ করে সিজারিয়ান ডেলিভারির পর ক্ষতের যত্নে অবহেলা করলে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ব্যথা অস্বাভাবিক মনে হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে বিপজ্জনক
সন্তান জন্মের পর কয়েকদিন রক্তপাত স্বাভাবিক ঘটনা। তবে অল্প সময়ের মধ্যে বারবার প্যাড ভিজে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা তীব্র দুর্বলতা দেখা দিলে তা বিপদের লক্ষণ হতে পারে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ দ্রুত চিকিৎসা না করলে প্রাণঘাতী অবস্থাও তৈরি করতে পারে।
সংক্রমণের ঝুঁকি
প্রসবের পর জরায়ু, মূত্রনালি কিংবা সেলাইয়ের স্থানে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। জ্বর, কাঁপুনি, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বা তীব্র ব্যথা হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। অবহেলা করলে সংক্রমণ শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বুকের দুধ খাওয়ানোর জটিলতা
নতুন মায়েদের অনেকেই স্তন ফুলে যাওয়া, স্তনবৃন্ত ফেটে যাওয়া বা স্তনে সংক্রমণের মতো সমস্যায় ভোগেন। এতে বুকের দুধ খাওয়ানো কষ্টকর হয়ে ওঠে। স্তনে ব্যথা, জ্বর বা অস্বাভাবিক ফোলাভাব দেখা দিলে দ্রুত পরামর্শ নেওয়া দরকার। সঠিক পদ্ধতিতে শিশুকে দুধ খাওয়ানো শিখলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমানো যায়।
থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতা
প্রসবের পর কিছু নারীর শরীরে থাইরয়েড হরমোনের পরিবর্তন দেখা দেয়। এতে হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি ও বিষণ্নতাও দেখা দেয়। অনেক সময় সাধারণ প্রসব-পরবর্তী দুর্বলতার সঙ্গে এসব লক্ষণ মিলিয়ে যায় বলে রোগটি সহজে শনাক্ত হয় না।
হঠাৎ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি
গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলেও সন্তান জন্মের পর কিছু নারীর হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। তীব্র মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা, শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা বা শরীর ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। কারণ এই সমস্যা গুরুতর অবস্থার দিকে যেতে পারে।
মায়ের যত্ন কেন সমান গুরুত্বপূর্ণ
নবজাতকের যত্নের পাশাপাশি একজন মায়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ সুস্থ মা-ই একটি শিশুর নিরাপদ ও সুন্দর বেড়ে ওঠার ভিত্তি তৈরি করেন। তাই প্রসবের পর কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা কষ্টকে লুকিয়ে না রেখে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, মানসিক সমর্থন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এই সময় একজন মায়ের সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।