নিজেদের জীবনে আধুনিকতা, মুসলিম সমাজের ক্ষেত্রে মধ্যযুগীয় বিধান—বামপন্থীদের একাংশের বিরুদ্ধে এমনই দ্বিচারিতার অভিযোগ তুললেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin)। তাঁর দাবি, ইসলামি উগ্রপন্থীদের পাশাপাশি তথাকথিত প্রগতিশীল ও বামপন্থীদের একটি অংশও মুসলিম সমাজের ‘অচলাবস্থা’ বজায় রাখতে ভূমিকা রাখছে।
তসলিমা(Taslima Nasrin)-র অভিযোগ, মুসলিম সমাজের সংস্কার, নারী-পুরুষের সমানাধিকার কিংবা স্বাধীনতার পক্ষে কেউ সরব হলেই তাঁকে ‘মুসলমান-বিদ্বেষী’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অথচ একই ব্যক্তিরা নিজেদের জীবনে বাকস্বাধীনতা, আধুনিকতা এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকারের পক্ষে অবস্থান নেন।
‘মুসলিম সমাজকে অন্ধকারে রাখতে সক্রিয় বামেদের একাংশ’
তসলিমা নাসরিন(Taslima Nasrin)-এর বক্তব্য, মুসলিম সমাজকে অন্ধকারে রাখার ক্ষেত্রে শুধু ইসলামি উগ্রপন্থীরাই দায়ী নন। তাঁর মতে, বামপন্থী ও তথাকথিত প্রগতিশীলদের একটি অংশও সেই সামাজিক কাঠামোকে রক্ষা করতে চান।
তাঁর অভিযোগ, নিজেরা বাকস্বাধীনতা ও নারী-পুরুষের সমানাধিকার ভোগ করলেও ইসলামের সমালোচক বা সংস্কারকদের বিরুদ্ধে তাঁরা ‘মুসলমান-বিদ্বেষী’ তকমা ব্যবহার করেন। এই অবস্থানকে তিনি প্রগতিশীলতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করেন।
রাজা রামমোহন রায়ের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তসলিমার
নিজের বক্তব্যের পক্ষে উদাহরণ দিতে গিয়ে রাজা রামমোহন রায়ের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন তসলিমা। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে রামমোহন রায়ের আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে তাঁর প্রশ্ন—কোনও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে কি একইসঙ্গে পৃথিবীর সব ধর্মের সব কুসংস্কারের বিরুদ্ধেই লড়াই করতে হবে?
তসলিমার দাবি, মুসলিম মহিলাদের অধিকার নিয়ে কথা বলার কারণে তাঁকেও নিয়মিত আক্রমণ ও কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়। তাঁর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা হয়, তিনি কেন একইভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়ছেন না।
তাঁর যুক্তি, এই একই মানদণ্ড যদি রামমোহন রায়ের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর আন্দোলনকেও কি এই বলে খারিজ করে দেওয়া হবে যে তিনি বিশ্বের সব ধর্মের সব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়াই করেননি?
‘নিজেদের মেয়ের অধিকার স্বাধীনতা, মুসলিম মেয়ের পরাধীনতা সংস্কৃতি?’
বামপন্থীদের একাংশের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ আরও স্পষ্ট করে তসলিমা বলেন, নিজেদের জন্য আধুনিক জীবনযাপন ও স্বাধীনতা কামনা করলেও তাঁরা মুসলিম সমাজের ক্ষেত্রে পুরনো ও রক্ষণশীল বিধানকে সমর্থন করেন।
বিশেষ করে নারীর অধিকার নিয়ে তাঁদের অবস্থানকে প্রশ্ন করেছেন তিনি। তসলিমার বক্তব্য অনুযায়ী, নিজেদের মেয়েদের অধিকারকে যদি ‘স্বাধীনতা’ বলা হয়, তাহলে মুসলিম মেয়েদের অধিকার ও স্বাধীনতা সীমিত রাখাকে ‘সংস্কৃতি’ বলে ব্যাখ্যা করা যায় না।
তাঁর মতে, যে ব্যক্তি নিজের জন্য আধুনিকতা চান, কিন্তু মুসলিম সমাজের জন্য মধ্যযুগীয় বিধানকে সমর্থন করেন, তিনি মুসলিম সমাজের প্রকৃত বন্ধু নন। একইভাবে, নিজের পরিবারের মেয়েদের স্বাধীনতা সমর্থন করে অন্য সমাজের মেয়েদের পরাধীনতাকে সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা প্রগতিশীলতার পরিচয় হতে পারে না।
বামেদের উদ্দেশে তসলিমার প্রশ্ন
তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য ঘিরে মূল প্রশ্নটি দাঁড়াচ্ছে—নারীর অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে কি সবার জন্য একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়?
তাঁর অবস্থান, ধর্ম বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে কুসংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার থাকা উচিত। কোনও ধর্মীয় সমাজের সংস্কারের কথা বললেই সেটিকে মুসলমান-বিরোধিতা হিসেবে দেখার প্রবণতার বিরুদ্ধেই সরব হয়েছেন তিনি।
তবে তসলিমার এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। কারণ, ধর্মীয় সংস্কার, সংখ্যালঘু অধিকার এবং বামপন্থী রাজনীতির ভূমিকা—তিনটি সংবেদনশীল বিষয়ই তাঁর বক্তব্যে একসঙ্গে উঠে এসেছে।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.