বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তম কুমার শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি বাঙালির আবেগের নাম। পর্দায় তাঁর অভিনয় যেমন দর্শককে মুগ্ধ করেছে, তেমনই ব্যক্তিজীবনেও তাঁর অধ্যবসায় ও নিজেকে প্রতিনিয়ত আরও নিখুঁত করে তোলার মানসিকতা ছিল অনুকরণীয়। তাঁর জীবনের এমনই এক অনুপ্রেরণামূলক ঘটনার সাক্ষী ছিলেন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক নিমাই ভট্টাচার্য।
সময়টা গত শতকের পাঁচের দশক। তখনও বাংলা সিনেমার জগতে নিজের জায়গা তৈরি করার জন্য লড়াই করছেন তরুণ উত্তম কুমার। ভবানীপুরের বাড়ি থেকে বাসে করে নিয়মিত সিঁথির মোড়ের এমপি স্টুডিওতে যাতায়াত করতেন তিনি। একই বাসে প্রায়ই দেখা হতো সাহিত্যিক ও সাংবাদিক নিমাই ভট্টাচার্যের সঙ্গে। পেশার সূত্রে তিনিও সেই এলাকায় টিউশনি করতে যেতেন। নিয়মিত যাতায়াতের সূত্র ধরেই ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব।
এর কয়েক বছর পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ততদিনে উত্তম কুমার বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা। অন্যদিকে সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন নিমাই ভট্টাচার্য। সেই সময় দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে ঘটে যায় এমন একটি ঘটনা, যা উত্তম কুমারের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থেকে যায়। একটি সম্মাননা গ্রহণের জন্য দিল্লিতে গিয়েছিলেন উত্তম কুমার। সেখানে আকাশবাণীর এক প্রতিনিধি তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে আসেন। সাক্ষাৎকারটি সারা দেশে সম্প্রচারিত হওয়ার কথা ছিল। নিমাই ভট্টাচার্যও সেই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষাৎকার শুরু হতেই দেখা গেল, সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর ইংরেজিতে দিচ্ছেন উত্তম কুমার। কিন্তু কথার মধ্যে বেশ কিছু ব্যাকরণগত ভুল থেকে যাচ্ছে। বিষয়টি দ্রুত বুঝতে পারেন নিমাইবাবু। বন্ধুর পাশাপাশি একজন জাতীয় তারকার সম্মান যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, সেই চিন্তা থেকেই তিনি বুদ্ধি করে সাক্ষাৎকারটি মাঝপথে থামিয়ে দেন। সাংবাদিককে তিনি জানান, উত্তম কুমারকে একটি জরুরি কাজে বেরিয়ে যেতে হবে। প্রশ্নগুলো রেখে গেলে পরে এসে সাক্ষাৎকারটি রেকর্ড করা যাবে। বন্ধুর ইঙ্গিত বুঝে উত্তম কুমারও তাতে সম্মতি জানান।
সাংবাদিক চলে যাওয়ার পর নিমাই ভট্টাচার্য সরাসরি বন্ধুকে তাঁর ইংরেজির ভুলের কথা জানান। তিনি বোঝান, উত্তম কুমার তখন আর শুধু বাংলার তারকা নন, তাঁর কথা গোটা দেশের মানুষ শুনবে। তাই সাক্ষাৎকারে ইংরেজি বলার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। অদ্ভুত বিষয় হল, একজন সুপারস্টারের ভুল ধরিয়ে দেওয়ায় উত্তম কুমার বিন্দুমাত্র রাগ করেননি। বরং নিজের ভুল স্বীকার করে নিমাইবাবুর সঙ্গে বসে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নতুন করে তৈরি করেন। ইংরেজি বাক্যগুলিকে ঠিকঠাক করে প্রস্তুতি নেন তিনি। দু’দিন পর ফের সেই সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা হয়।
কয়েক মাস পর একদিন নিমাই ভট্টাচার্যকে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেন উত্তম কুমার। আড্ডার মাঝখানে হঠাৎ তিনি জানান, শেক্সপিয়রের কবিতা আবৃত্তি করে শোনাবেন। এরপর তাঁর সঙ্গে শুধু ইংরেজিতেই কথা বলবেন।
তারপর যা দেখেছিলেন নিমাই ভট্টাচার্য, তা তাঁর কাছে ছিল অবিশ্বাস্য। উত্তম কুমার সাবলীলভাবে ইংরেজিতে কথা বলতে শুরু করেন। উচ্চারণে জড়তা নেই, কথায় ভুল নেই। কয়েক মাস আগের সেই সাক্ষাৎকারের উত্তম কুমারের সঙ্গে যেন এই মানুষটির কোনও মিলই নেই! এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছিল, ভুল বা দুর্বলতা কোনও মানুষের স্থায়ী পরিচয় নয়। নিজের ভুলকে স্বীকার করে তা সংশোধনের জন্য যদি কেউ আন্তরিকভাবে পরিশ্রম করেন, তাহলে নিজেকে বদলে ফেলা সম্ভব।
আরও পড়ুন,
Bonny: নতুন পোস্টে নজর কাড়লেন বনি সেনগুপ্ত, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসার ঝড়
উত্তম কুমারের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছিল। খ্যাতির শিখরে পৌঁছে যাওয়ার পরও তিনি নিজের দুর্বলতাকে অহংকারের আড়ালে লুকিয়ে রাখেননি। বরং ভুল স্বীকার করে তা শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সম্ভবত এই আত্মসংশোধনের মানসিকতা, শেখার ইচ্ছা এবং নিরলস পরিশ্রমই তাঁকে শুধু জনপ্রিয় অভিনেতা নয়, বাঙালির চিরকালের ‘মহানায়ক’ করে তুলেছিল।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.