সনাতন হিন্দু ধর্মে সিদ্ধিদাতা শ্রী গণেশকে প্রজ্ঞা, নম্রতা ও বিঘ্নবিনাশের প্রতীক হিসেবে মানা হয়। অন্যদিকে চন্দ্রদেব হলেন সৌন্দর্য, শীতলতা ও শুভ্রতার প্রতীক। পুরাণে এই দুই দেবতার মধ্যে এক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গণেশ চতুর্থীর দিনে চন্দ্র দর্শন না করার প্রথা।
কেন গণপতির সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছিলেন চন্দ্রদেব? কী কারণে গণেশজি তাঁকে অভিশাপ দিয়েছিলেন? আর কীভাবেই বা সেই অভিশাপের প্রভাব থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন চন্দ্রদেব? জেনে নিন এই পৌরাণিক কাহিনি।
কুবেরের ভোজে গণপতির আগমন
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, একবার ধনাধ্যক্ষ কুবের একটি বিশাল ভোজের আয়োজন করেন। সেই ভোজে গণপতিও আমন্ত্রিত ছিলেন। সেখানে তিনি প্রচুর মোদক ও মিষ্টি আহার করেন।
খাওয়া শেষে গণপতির পেট অত্যন্ত ভারী হয়ে যায়। এরপর তিনি তাঁর বাহন ইঁদুরের পিঠে চড়ে কৈলাসের দিকে রওনা দেন।
ইঁদুরের ভয়ে ঘটে বিপত্তি
পথের মধ্যে হঠাৎ একটি সাপ ইঁদুরের সামনে চলে আসে। সাপ দেখে ইঁদুর ভয় পেয়ে লাফিয়ে ওঠে। ফলে ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান গণপতি। তাঁর পেট থেকে মোদক বেরিয়ে আসে।
তবে গণপতি বিচলিত হননি। তিনি সমস্ত মোদক আবার তুলে নেন এবং পেটের চারপাশে একটি সাপকে কোমরবন্ধের মতো বেঁধে নেন।
গণপতির রূপ দেখে হাসলেন চন্দ্রদেব
এই ঘটনাটি দেখে আকাশে অবস্থানরত চন্দ্রদেব হাসতে শুরু করেন। নিজের সৌন্দর্য ও রূপ নিয়ে অহংকারের কারণে তিনি গণপতির চেহারা নিয়ে উপহাস করেন।
চন্দ্রদেবের এই আচরণে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন গণপতি। তিনি মনে করেন, কারও শারীরিক গঠন বা বিপদের মুহূর্ত নিয়ে উপহাস করা অত্যন্ত অন্যায়।
চন্দ্রদেবকে অভিশাপ দিলেন গণপতি
চন্দ্রদেবের অহংকার ভাঙতে গণপতি তাঁকে অভিশাপ দেন। তাঁর অভিশাপে চন্দ্রদেবের সৌন্দর্য ও কান্তি নষ্ট হয়ে যায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে অন্ধকার।
চন্দ্রের আলো না থাকায় দেবতা থেকে শুরু করে সমগ্র সৃষ্টিজগতে সমস্যা দেখা দেয়। চন্দ্রদেবও নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং গণপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
তপস্যায় প্রসন্ন হলেন গণপতি
নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে চন্দ্রদেব গণপতির কঠোর তপস্যা শুরু করেন। দেবতারাও গণপতির কাছে চন্দ্রদেবকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
শেষ পর্যন্ত গণপতি তাঁর প্রতি প্রসন্ন হন। তবে অভিশাপ পুরোপুরি তুলে না নিয়ে তার প্রভাব লাঘব করেন।
এরপর থেকেই চাঁদের ক্ষয় ও বৃদ্ধির চক্র শুরু হয়েছে বলে পৌরাণিক কাহিনিতে উল্লেখ করা হয়। কৃষ্ণপক্ষে চাঁদের আলো ধীরে ধীরে কমে যায় এবং শুক্লপক্ষে তা আবার বাড়তে থাকে।
কেন গণেশ চতুর্থীতে চাঁদ দেখা নিষেধ?
গণপতির অভিশাপের একটি অংশ অনুযায়ী, ভাদ্রপদ মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে চন্দ্র দর্শন করলে মিথ্যা অপবাদ বা কলঙ্কের মুখে পড়তে হতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়।
এই কারণেই গণেশ চতুর্থীর রাতে চাঁদ না দেখার প্রচলন রয়েছে। ভুলবশত চন্দ্র দর্শন হয়ে গেলে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রথায় এর প্রতিকার করার কথাও বলা হয়েছে।
পুরাণে শ্রীকৃষ্ণের শ্যামন্তক মণি চুরির মিথ্যা অভিযোগের ঘটনাকেও এই চন্দ্র দর্শনের অভিশাপের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
কী শিক্ষা দেয় এই পৌরাণিক কাহিনি?
গণপতি ও চন্দ্রদেবের এই কাহিনির মধ্যে রয়েছে গভীর নৈতিক শিক্ষা। রূপ, সৌন্দর্য, বিদ্যা কিংবা সম্পদ নিয়ে অহংকার কখনও শুভ ফল বয়ে আনে না। অন্যের শারীরিক গঠন, দুর্বলতা বা বিপদের মুহূর্ত নিয়ে উপহাস করাও উচিত নয়।
গণপতি স্থাপনের শুভ মুহূর্ত আড়াই ঘণ্টা, জেনে নিন গণেশ চতুর্থীর পুজোর সময় ও নিয়ম
এই কারণেই গণেশ চতুর্থীর চন্দ্র দর্শনের নিষেধাজ্ঞার পেছনে থাকা পৌরাণিক কাহিনি আজও ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
Sumi has been waiting lifestyle, vastu Tips since 2026.