পুরীর জগন্নাথ মন্দির শুধু ধর্মীয় ভাবাবেগের কেন্দ্র নয়, বিপুল সম্পত্তি ও আর্থিক সম্পদেরও অধিকারী। মন্দির প্রশাসনের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মন্দিরের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১,৯১১.৮০ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের মালিকানাধীন জমির পরিমাণ প্রায় ৬০,৮২১ একর। এর পাশাপাশি রত্নভাণ্ডারে রয়েছে সোনা, রুপো, হিরে, পান্না, প্রবাল ও মুক্তো-সহ বহু মূল্যবান অলঙ্কার।
শ্রীজগন্নাথ মন্দির প্রশাসন (SJTA) বুধবার একটি বিবৃতিতে মন্দিরের আর্থিক সম্পদ ও জমিজমার হিসাব প্রকাশ করেছে। সেই হিসাব থেকেই সামনে এসেছে মন্দিরের বিপুল সম্পত্তির চিত্র।
ব্যাঙ্কে প্রায় ১,৯১২ কোটি টাকা
SJTA-র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩১ অগস্ট পর্যন্ত মন্দিরের তিনটি পৃথক প্রকল্পে মোট ১,৮১১.১০ কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিটে রাখা ছিল। এর মধ্যে ১,৩১১.১০ কোটি টাকা বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে জমা রয়েছে। বাকি ৫০০ কোটি টাকা ওডিশা সরকারের দেওয়া একটি কর্পাস ফান্ডে রাখা হয়েছে। মন্দিরের লাভ-ক্ষতির হিসাবের ক্ষেত্রেও এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়াও মন্দিরের বিভিন্ন সেভিংস, কারেন্ট এবং ফ্লেক্সি অ্যাকাউন্টে ছিল ১০০.৭১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ৩১ অগস্ট পর্যন্ত ব্যাঙ্কে মন্দিরের মোট জমা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৯১১.৮০ কোটি টাকা।
কোথা থেকে আসে মন্দিরের আয়?
মন্দিরের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ভক্তদের অনুদান। পাশাপাশি মন্দিরের মালিকানাধীন খনি ও খাদান, ফিক্সড ডিপোজিট থেকে পাওয়া সুদ, জমি বিক্রি ও অধিগ্রহণ এবং সরকারি অনুদান থেকেও আয় হয়। SJTA-র মুখ্য প্রশাসক অরবিন্দ পাধি জানিয়েছেন, আয়ের একটি অংশ কর্পাস ফান্ড এবং আর একটি অংশ ফাউন্ডেশন ফান্ড হিসেবে ফিক্সড ডিপোজিটে রাখা হয়। বাকি অর্থ মন্দিরের তহবিলে থাকে। মন্দিরের দৈনন্দিন খরচ এই তহবিল থেকেই মেটানো হয়। অতিরিক্ত অর্থ ফের ফিক্সড ডিপোজিটে রাখা হয়।
হুন্ডির টাকার হিসাবও প্রকাশ করা হয়
ভক্তদের দেওয়া অনুদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখার উপরেও জোর দিয়েছে মন্দির প্রশাসন। হুন্ডিতে জমা পড়া টাকা প্রতিদিন গোনা হয়। সেই হিসাব জনসাধারণকে জানাতে তথ্যপ্রদর্শন বোর্ডে প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি সমাজমাধ্যমেও সেই তথ্য দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে প্রশাসন। এ বছর রথযাত্রার আগে ১৫ জুলাই ‘সমর্পণ’ নামে একটি ডিজিটাল অনুদান প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশ-বিদেশের ভক্তেরা অনলাইনে মন্দিরে অনুদান দিতে পারছেন এবং রসিদও সংগ্রহ করতে পারছেন। ৩১ অগস্ট পর্যন্ত এই প্ল্যাটফর্মে ৫৬.৭১ লক্ষ টাকা অনুদান জমা পড়েছে।
মন্দিরের জমি কত?
পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের শুধু আর্থিক সম্পদই নয়, জমির পরিমাণও বিপুল। প্রশাসনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মন্দিরের মোট ৬০,৮২১ একর জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৬০,৪২৬ একর জমি রয়েছে ওডিশার ২৪টি জেলায়। বাকি ৩৯৫ একর জমি পশ্চিমবঙ্গ-সহ আরও ছয়টি রাজ্যে ছড়িয়ে রয়েছে।
রত্নভাণ্ডারে কী কী রয়েছে?
জগন্নাথ মন্দিরের সবচেয়ে আলোচিত সম্পদগুলির অন্যতম হল ঐতিহাসিক রত্নভাণ্ডার। সোনা, রুপো, হিরে, পান্না, প্রবাল ও মুক্তো-সহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে। ২০২৪ সালে দীর্ঘ প্রায় ৪৬ বছর পর রত্নভাণ্ডারের দরজা খোলা হয়েছিল। তবে ভিতরে থাকা সম্পদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সে সময় প্রকাশ করেনি মন্দির কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ১৯৭৮ সালের তালিকাকে ভিত্তি করে নতুন করে সম্পদের ইনভেন্টরি তৈরির কাজ চলছে। অরবিন্দ পাধির বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের নির্ধারিত SOP মেনে এই প্রক্রিয়ার তৃতীয় পর্যায়ের কাজ চলছে। গোটা কাজটি CCTV-র নজরদারিতে করা হচ্ছে এবং ভিডিয়ো রেকর্ডিংও করা হচ্ছে। শুধুমাত্র অনুমোদিত ব্যক্তিদেরই সেখানে থাকার অনুমতি রয়েছে।
পুরনো নথিতে বিপুল সোনার উল্লেখ
মন্দির কর্তৃপক্ষ বর্তমানে রত্নভাণ্ডারের সম্পদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করলেও, ২০১১ সালের ‘ওডিশা রিভিউ’-এর একটি প্রতিবেদনে রত্নভাণ্ডারে থাকা সম্ভাব্য সম্পদের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ওডিশার রাজা অনঙ্গভীম দেব একসময় জগন্নাথদেবের অলঙ্কার তৈরির জন্য প্রায় দেড় হাজার কেজি সোনা দান করেছিলেন। রত্নভাণ্ডারে তার উল্লেখযোগ্য অংশ সংরক্ষিত রয়েছে বলেও ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল। নথি অনুযায়ী, বাইরের কক্ষে জগন্নাথদেবের সোনার মুকুট, তিনটি সোনার হরিদকণ্ঠী মালা, সোনার শ্রীভুজ, সোনার পা-সহ একাধিক মূল্যবান অলঙ্কার রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিটি হরিদকণ্ঠী মালার ওজন প্রায় ১২০ তোলা বা আনুমানিক ১.৪ কেজি বলে দাবি করা হয়েছিল। ভিতরের রত্নকক্ষে প্রায় ৭৪টি ভারী সোনার অলঙ্কারের উল্লেখ রয়েছে, যেগুলির প্রতিটির ওজন প্রায় এক কেজি বা তার বেশি। পাশাপাশি হিরে, পান্না, প্রবাল ও মুক্তো খচিত নানা অলঙ্কার এবং প্রায় ১৪০টি ভারী রুপোর গয়নার কথাও ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল।
জগন্নাথদেবের অলঙ্কারের তালিকায় সোনার ময়ূরের পালক, চালুপাটি, শ্রীকুণ্ডল, কদম্বমালা, চক্র, গদা, পদ্ম ও শঙ্খের উল্লেখ রয়েছে। জগন্নাথ ও সুভদ্রার জন্য রত্নখচিত তৃতীয় নয়নের কথাও বলা হয়েছে, যার একটিতে হিরে এবং অন্যটিতে পান্না বসানো রয়েছে। তবে রত্নভাণ্ডারের পুরনো নথিতে থাকা এই তথ্যগুলির সবকটি বর্তমান মন্দির প্রশাসন আনুষ্ঠানিক ভাবে নিশ্চিত করেনি। ফলে ঐতিহাসিক নথিতে থাকা সম্পদের পরিমাণ এবং বর্তমানে রত্নভাণ্ডারে থাকা সম্পদের প্রকৃত মূল্য—দুটিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। প্রতি বছর রথযাত্রার সময় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে সোনার অলঙ্কারে সাজানো হয়। সেই অপরূপ ‘সোনাবেশ’ দেখতে ভিড় করেন লক্ষ লক্ষ ভক্ত। কিন্তু রত্নভাণ্ডারে থাকা বিপুল সম্পদের ঠিক কতটা সেই সাজে ব্যবহার করা হয়, তার কোনও সরকারি নিশ্চিত হিসাব এখনও প্রকাশ্যে নেই।
সব মিলিয়ে, মন্দির প্রশাসনের প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাব বলছে—প্রায় ১,৯১২ কোটি টাকা ব্যাঙ্কে, ৬০,৮২১ একর জমি এবং রত্নভাণ্ডারে বিপুল মূল্যবান সামগ্রী। এই হিসাবই পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের আর্থিক ও সম্পত্তিগত বিস্তারের একটি বড় ছবি তুলে ধরছে।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.