সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে মাছ ধরতে গিয়ে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের হামলায় গুরুতর জখম হয়েছিলেন ৩৬ বছরের মৎস্যজীবী আজিত মোল্লা। এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর ‘ব্রেন ডেথ’ ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। এরপর পরিবারের সম্মতিতে তাঁর অঙ্গদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ সফল হল না। অঙ্গ সংগ্রহের অস্ত্রোপচারের সময়ই থেমে গেল আজিতের হৃদ্যন্ত্র। ফলে কর্নিয়া ছাড়া তাঁর অন্য কোনও অঙ্গ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। গত বুধবার বিদ্যা নদী সংলগ্ন কালীবেরার চরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইলিশ ধরতে গিয়েছিলেন কুলতলির মৈপীঠের নগেনাবাদের বাসিন্দা আজিত। মাছ ধরার জাল নদীর চরে আটকে যাওয়ায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সেটি ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। সেই সময় আচমকা পিছন থেকে তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার।
বাঘের আক্রমণে গুরুতর জখম হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আজিত। তাঁর সঙ্গে থাকা হজরত মোল্লা, আনসার মোল্লা, আলম মোল্লা, হাফিজুল মোল্লা এবং রেজ্জাক মোল্লা একযোগে বাধা দেওয়ায় বাঘটি তাঁকে টেনে নিয়ে যেতে পারেনি। এরপর দ্রুত তাঁকে জামতলা গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ক্ষত গুরুতর হওয়ায় সেখান থেকে তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে রেফার করা হয়। সেখানেই কয়েক দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন আজিত। রবিবার চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর মস্তিষ্কের মৃত্যু হয়েছে। এরপর এসএসকেএমে থাকা রোটো (রিজিওনাল অর্গান অ্যান্ড টিস্যু ট্রান্সপ্লান্ট অর্গানাইজেশন)-র প্রতিনিধিরা পরিবারের সঙ্গে অঙ্গদানের বিষয়ে কথা বলেন। প্রিয়জনকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় জানতে পেরে মানবিক সিদ্ধান্ত নেন পরিবারের সদস্যেরা।
মঙ্গলবার আজিতের স্ত্রী তসলিমা অঙ্গদানের সম্মতিপত্রে সই করেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাঁর যকৃৎ, কিডনি এবং কর্নিয়া সংগ্রহ করা হবে। পরিবারের তরফেও জানানো হয়েছিল, আজিতের অঙ্গ অন্য মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজে লাগলে তাঁদের কিছুটা হলেও শান্তি মিলবে। আজিতের ভাই হাফিজুল মোল্লা বলেন, হাসপাতালের তরফে তাঁদের কোনও চাপ দেওয়া হয়নি। চিকিৎসকেরা অঙ্গদানের বিষয়টি বোঝানোর পরেই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন। চার সন্তানকে রেখে চলে যাওয়া আজিতের অঙ্গ অন্য মানুষের শরীরে বেঁচে থাকুক—এই ভাবনাই পরিবারকে অঙ্গদানে সম্মতি দিতে উৎসাহিত করেছিল।
আজিতের পরিবার সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার একটি নিম্নবিত্ত পরিবার। পরিবারের শিক্ষাগত পরিসরও খুব বেশি নয়। আজিত নিজে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও অঙ্গদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিবারের এই সিদ্ধান্তকে দৃষ্টান্তমূলক বলেই মনে করছেন চিকিৎসকদের একাংশ। এসএসকেএমের নেফ্রোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক অর্পিতা রায়চৌধুরী জানান, অঙ্গদান নিয়ে সমাজে এখনও নানা কুসংস্কার ও ভুল ধারণা রয়েছে। সেই জায়গায় সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার একটি মুসলিম পরিবারের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কথায়, পরিবারের এই উদ্যোগ অঙ্গদান আন্দোলনের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে একটি বড় প্রাপ্তি।একই মত ‘বেঙ্গল অর্গান ডোনেশন সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা-চেয়ারম্যান চিকিৎসক সৌরভ কোলেরও। তাঁর বক্তব্য, জীবিকার সন্ধানে গিয়ে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে এক যুবকের মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক। সেই শোকের মধ্যেও পরিবারের অঙ্গদানের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে পরিবারের সেই মহৎ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পেল না। অঙ্গ সংগ্রহের অস্ত্রোপচারের সময়ই হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যায় আজিতের। ফলে যকৃৎ ও কিডনি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এখন তাঁর কর্নিয়াই কেবল অন্য কারও দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আরও পড়ুন,
দিল্লিতে মণিপুরি গায়ককে পিটিয়ে খুন, ‘নিরাপত্তা কোথায়?’ প্রশ্ন রাহুলের
বাঘের হামলায় এক তরুণ মৎস্যজীবীর মর্মান্তিক মৃত্যু যেমন সুন্দরবনের কঠিন জীবনযাত্রার ছবি সামনে আনল, তেমনই মৃত্যুর পরেও অন্যকে বাঁচানোর জন্য তাঁর পরিবারের নেওয়া সিদ্ধান্ত মানবিকতার এক অনন্য নজির হয়ে রইল।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.