বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নেমে এল শোকের ছায়া। প্রয়াত হলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান চিত্রপরিচালক রাজা সেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছিলেন পরিচালক। নিউমোনিয়া ও ফুসফুসের সমস্যার কারণে তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। তাঁর প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেছেন স্ত্রী তথা অভিনেত্রী পাপিয়া সেন।
রাজা সেনের শারীরিক সমস্যার সূত্রপাত প্রায় এক দশক আগে। ‘মায়ামৃদঙ্গ’ ছবির শুটিংয়ের সময় সেটে পড়ে গিয়ে গুরুতর কোমরের চোট পেয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে তাঁর হাঁটাচলা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। গত কয়েক বছর ধরে প্রায় চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়েছিলেন পরিচালক। ২০২৬ সালের শুরুতে গুরুতর স্নায়ুর সমস্যা ধরা পড়ে। কোমর ও শিরদাঁড়ায় অস্ত্রোপচারও হয় তাঁর। চিকিৎসার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও সম্প্রতি নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে প্রয়াত হন তিনি।
রাজা সেনের চলচ্চিত্রে বারবার উঠে এসেছে বাঙালির চেনা জীবন, মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সাহিত্যের গভীর মানবিকতা। সহজ-সরল অথচ আবেগঘন গল্প বলার নিজস্ব ভঙ্গিতে তিনি দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও তপন সিংহের পরবর্তী সময়ে বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে যে পরিচালকেরা নিজস্ব ভাষায় গল্প বলার ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, রাজা সেন তাঁদের অন্যতম।
বড়পর্দার পাশাপাশি বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসেও রাজা সেনের অবদান উল্লেখযোগ্য। আশাপূর্ণা দেবীর উপন্যাস অবলম্বনে তাঁর পরিচালিত ধারাবাহিক ‘সুবর্ণলতা’ বাঙালি দর্শকের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এছাড়াও ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ এবং ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর মতো কালজয়ী সাহিত্যকর্মকে ছোটপর্দায় তুলে ধরেছিলেন তিনি। সাহিত্যনির্ভর এই কাজগুলিতে তাঁর পরিচালনার স্বতন্ত্র ছাপ স্পষ্ট ছিল।
রাজা সেন শুধু কথাসাহিত্যনির্ভর ছবি বা ধারাবাহিকেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। বাংলা সংস্কৃতি ও শিল্পজগতের বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন তিনি। সুচিত্রা মিত্র, শম্ভু মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং তপন সিংহের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে নিয়ে তাঁর তৈরি তথ্যচিত্রগুলি বাংলা সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও বিবেচিত হয়। রাজা সেনের দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম বড় স্বীকৃতি ছিল জাতীয় পুরস্কার। তাঁর ঝুলিতে ছিল তিনটি জাতীয় পুরস্কার।
সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রের জন্য আর্ট অ্যান্ড কালচার বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পান রাজা সেন। এটিই ছিল তাঁর প্রথম জাতীয় সম্মান। ১৯৯৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দামু’ ছবিতে নানা ও নাতির সম্পর্কের আবেগ, সরলতা এবং মানবিকতার গল্প তুলে ধরেছিলেন তিনি। ছবিটি সেরা শিশু চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে।
যৌথ পরিবারের সম্পর্ক, টানাপোড়েন এবং পারস্পরিক বন্ধনের গল্প নিয়ে তৈরি ‘আত্মীয় স্বজন’ও জাতীয় স্তরে সম্মানিত হয়। সেরা পারিবারিক চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পায় ছবিটি। ‘দামু’ ও ‘আত্মীয় স্বজন’-এর পাশাপাশি রাজা সেন পরিচালনা করেছেন ‘দেশ’, ‘দেবীপক্ষ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ এবং ‘ল্যাবরেটরি’-র মতো ছবি। তাঁর কাজের পরিধিতে যেমন ছিল সাহিত্যনির্ভর গল্প, তেমনই ছিল পারিবারিক সম্পর্ক ও সমাজজীবনের নানা দিক।
বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্য ও মানবিকতার মেলবন্ধন ঘটানো পরিচালকদের তালিকায় তাই রাজা সেনের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাজা সেনের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বাংলা চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি জগতে। স্ত্রী তথা অভিনেত্রী পাপিয়া সেনের জন্যও এই মৃত্যু এক গভীর ব্যক্তিগত শোকের মুহূর্ত।
সত্তর বছরের জীবনে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও তথ্যচিত্রের মাধ্যমে যে সৃষ্টির জগত তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তাঁর প্রয়াণে সেই জগতেরই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হল। তবে ‘দামু’, ‘আত্মীয় স্বজন’ থেকে শুরু করে তাঁর সাহিত্যনির্ভর ও তথ্যচিত্রের কাজগুলি বাংলা সংস্কৃতির পরিসরে দীর্ঘদিন তাঁর স্মৃতি বহন করবে।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.