সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের নতুন ছবি ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ ঘিরে ইতিমধ্যেই দর্শক ও সিনেপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আগ্রহ। নাট্যকার ব্রাত্য বসুর নাটক অবলম্বনে তৈরি এই ছবিতে রাজনীতি, স্মৃতি, সময় এবং সম্পর্কের টানাপোড়েনকে এক ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন পরিচালক। এক সমালোচকের মতে, এমন ‘লিরিক্যাল রাজনৈতিক ছবি’ বাংলা সিনেমায় বিরল। ছবির কেন্দ্রে রয়েছে সব্যসাচী সেনের গল্প। রাজনৈতিকভাবে অস্থির এক সময়ে বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী সক্রিয় কর্মী সব্যসাচী পুলিশের হেফাজত থেকে পালিয়ে যায়। ভোরের কুয়াশায় পুলিশ তাকে গুলি করে। কিন্তু তার দেহের কোনও সন্ধান মেলে না। এরপর আচমকাই ফিরে আসে সব্যসাচী। তার দাবি, সে নাকি অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু বাস্তব বলছে অন্য কথা—তার অনুপস্থিতিতে কেটে গিয়েছে দীর্ঘ ২৫ বছর।
এই ২৫ বছরে বদলে গিয়েছে কলকাতা, বদলেছে মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি এবং বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বদল এসেছে গোটা পৃথিবীর ক্ষমতার বিন্যাসেও। অথচ সব্যসাচীর কাছে যেন সময় থেমে রয়েছে সেই আগের জায়গাতেই। ফলে বদলে যাওয়া সমাজের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নিতে গিয়ে সে হয়ে ওঠে এক সম্পূর্ণ ‘আউটসাইডার’। সব্যসাচীর চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তীর অভিনয় ছবির অন্যতম বড় আকর্ষণ। সমালোচকের ভাষায়, এই চরিত্রের জন্য ঋত্বিকই ছিলেন ‘রাইট চয়েস’। তাঁর অভিনয়ে একদিকে যেমন রয়েছে আপাত উদাসীনতা ও হালকামি, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে গভীরতা। ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অভিনেতাকে আলাদা করে মনে হয়নি—বরং তিনি যেন পুরোপুরি হয়ে উঠেছেন সব্যসাচী সেন।
সব্যসাচীর জীবনে সবচেয়ে বড় সংযোগ তার স্ত্রী রাজলক্ষ্মী। চরিত্রটি অভিনয় করেছেন অনসূয়া মজুমদার এবং সোহিনী সরকার। তরুণী ও মধ্যবয়স্ক রাজলক্ষ্মীর দুই সময়কে আলাদা না করে এক ধরনের রোমান্টিক আবহে মিলিয়ে দিয়েছেন পরিচালক। প্রেম, স্মৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া সময়ের অনুভূতি আরও গভীর হয়েছে রাপূর্ণার গানে। তবে সব্যসাচীর ফিরে আসার পর সবচেয়ে বড় সংঘাত তৈরি হয় তাঁর ছেলে ইন্দ্রর সঙ্গে। ইন্দ্রর চরিত্রে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। ২৫ বছর পর ফিরে আসা বাবাকে তাঁর সমবয়সি একজন তরুণের মতো দেখায়। ফলে ইন্দ্রের পক্ষে তাঁকে সহজে বাবার জায়গায় বসানো সম্ভব হয় না। এমনকী, বাবাকে নাম ধরেও সম্বোধন করে সে।

ইন্দ্র রাজনৈতিকভাবে সব্যসাচীর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে। সে তৃণমূলের সদস্য এবং তার রাজনৈতিক অবস্থান বাবার বামপন্থী আদর্শের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তৈরি করে। ২০০২ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইন্দ্রের চরিত্রের ঔদ্ধত্য, আত্মবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে পরমব্রতের অভিনয়। ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে ঋত্বিক ও পরমব্রতের মুখোমুখি তর্ক-বিতর্ক। বাবা ও ছেলের রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাত ধীরে ধীরে ছবির কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করে। তাঁদের কথোপকথন শুধু রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সময়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, স্মৃতি এবং বিশ্বাসের পরিবর্তনের প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।

ছবির শেষদিকে রয়েছে বড় চমক। ক্লাইম্যাক্সের বিস্তারিত প্রকাশ না করলেও, ছবির শুরু থেকেই যে রাজনৈতিক ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তারই মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বিস্ফোরক পরিণতির বীজ। শেষ কয়েক মুহূর্তে সৃজিতের ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনাও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল সময়কে দেখার তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। ২৫ বছর ঘুমিয়ে থাকার পর সব্যসাচী যে পৃথিবীতে ফিরে আসে, সেটি তার চেনা পৃথিবী নয়। অন্যদিকে যারা এই ২৫ বছরের পরিবর্তনের সাক্ষী, তাঁদের কাছে সেই বদল স্বাভাবিক ও ধারাবাহিক। এই দুই ভিন্ন বাস্তবের সংঘাতই ছবির আবেগ ও দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।
আরও পড়ুম,
*একাধিক ছবির ব্যর্থতার পর বড় চমক, রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি নিয়ে মেগাবাজেট সিনেমা করণের
*শীঘ্রই ‘Bigg Boss’-এর ঘরে পা রাখবেন শন? অস্ত্রোপচারের পর হাসপাতাল থেকেই বড় আপডেট অভিনেতার
সব মিলিয়ে ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ শুধুমাত্র রাজনৈতিক ছবি নয়। স্মৃতি, সময়, সম্পর্ক এবং আদর্শের পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে তৈরি এই সিনেমা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করবে। ঋত্বিক-পরমব্রতের তর্ক-বিতর্ক যেমন ছবির মেরুদণ্ড, তেমনই রাপূর্ণার গান ছবির আবেগকে আরও গভীর করেছে। এমন একটি সিনেমা, যা শেষ হওয়ার পরও দর্শকের মনে প্রশ্ন ও বিতর্ক জিইয়ে রাখতে পারে।

Hello friends, Myself Biplab. I have been writing horoscopes since 2019. Since 2022, I have also been writing about entertainment, lifestyle, and trending news.