বয়স যেন বাধা না হয় মাতৃত্বে! ডিম্বাণু না ভ্রূণ—কোনটি সংরক্ষণ বেশি সুবিধার, খরচই বা কত?

কাজ, কেরিয়ার, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা সঠিক সঙ্গীর অপেক্ষা— নানা কারণে অনেক মহিলাই এখন তুলনামূলক বেশি বয়সে মাতৃত্বের পরিকল্পনা করছেন। সেই কারণেই প্রজননক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ডিম্বাণু সংরক্ষণ (Egg Freezing) এবং ভ্রূণ সংরক্ষণ (Embryo Freezing) নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। প্রযুক্তির সাহায্যে ভবিষ্যতের জন্য ডিম্বাণু কিংবা নিষিক্ত ভ্রূণ হিমায়িত করে রাখা সম্ভব।
সম্প্রতি মার্কিন রাজনীতিক আলেকজ়ান্দ্রিয়া ওকাসিয়ো-কোর্তেজও নিজের ডিম্বাণু সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। তার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে প্রশ্ন হল—ডিম্বাণু সংরক্ষণ, নাকি ভ্রূণ সংরক্ষণ, কোনটি বেশি সুবিধাজনক?

সূচিপত্র

ডিম্বাণু ও ভ্রূণ সংরক্ষণের মধ্যে পার্থক্য কী?

মহিলারা জন্মের সময়ই নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণু নিয়ে জন্মান। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান ধীরে ধীরে কমতে থাকে। বিশেষ করে ৩৫ বছরের পর প্রজননক্ষমতা কমার প্রবণতা বাড়ে।
ডিম্বাণু সংরক্ষণে মহিলার ডিম্বাণু সংগ্রহ করে ভবিষ্যতের জন্য হিমায়িত করে রাখা হয়। পরে প্রয়োজন হলে সেই ডিম্বাণু শুক্রাণুর সঙ্গে নিষিক্ত করে আইভিএফের মাধ্যমে গর্ভধারণের চেষ্টা করা যায়।
অন্য দিকে ভ্রূণ সংরক্ষণে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর নিষেক ঘটিয়ে প্রথমে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। সেই ভ্রূণকে হিমায়িত করে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা হয়।
অর্থাৎ, ভ্রূণ সংরক্ষণে সন্তানধারণের প্রক্রিয়াটি ডিম্বাণু সংরক্ষণের তুলনায় এক ধাপ এগিয়ে থাকে।

কাদের জন্য ডিম্বাণু সংরক্ষণ উপযুক্ত?

ডিম্বাণু সংরক্ষণ তাঁদের জন্য একটি বিকল্প হতে পারে—
*যাঁরা এখনই বিয়ে বা সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন না।
*ভবিষ্যতে নিজের ডিম্বাণু ব্যবহার করে মা হতে চান।
*কম বয়সেই ডিম্বাণুর সংখ্যা বা গুণমান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
*ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি বা রেডিয়োথেরাপি নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
*পিসিওএস, এন্ডোমেট্রিয়োসিস বা কম বয়সে মেনোপজ়ের পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে।
*কেরিয়ার বা ব্যক্তিগত কারণে মাতৃত্ব পিছিয়ে দিতে চান।

তবে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলেই ভবিষ্যতে সন্তান হবেই—এমন নিশ্চয়তা নেই। বয়স, ডিম্বাণুর গুণমান, সংরক্ষিত ডিম্বাণুর সংখ্যা এবং পরবর্তী সময়ে আইভিএফের ফলাফল—সবই গুরুত্বপূর্ণ।

ভ্রূণ সংরক্ষণ কাদের জন্য ভালো বিকল্প?

যাঁদের নির্দিষ্ট সঙ্গী রয়েছেন এবং ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ভ্রূণ সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে।

বিশেষ করে—
*দম্পতি বর্তমানে সন্তান নিতে না চাইলেও ভবিষ্যতে নিতে চান।
*মহিলার প্রজননক্ষমতা ভবিষ্যতে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
*পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা বা গুণমান কম।
*ক্যানসারের চিকিৎসার আগে প্রজননক্ষমতা সংরক্ষণ করতে চান।
*আইভিএফের মাধ্যমে একাধিক ভ্রূণ তৈরি হয়েছে।
*জিনগত রোগের পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে এবং ভ্রূণের জিনগত পরীক্ষা প্রয়োজন।
*ভবিষ্যতে একাধিক সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ভ্রূণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য ইতিমধ্যেই নিষিক্ত ভ্রূণ তৈরি থাকে। ফলে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটানোর ধাপটি পরে করতে হয় না।

কী ভাবে সংরক্ষণ করা হয় ডিম্বাণু?

ডিম্বাণু সংরক্ষণের আগে সাধারণত রক্ত পরীক্ষা, আলট্রাসাউন্ড এবং AMH (Anti-Müllerian Hormone) পরীক্ষার মাধ্যমে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও প্রজননক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়।
এর পরে হরমোন ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ডিম্বাশয়ে একাধিক ডিম্বাণু পরিণত করার চেষ্টা করা হয়। সাধারণত প্রায় ১০–১৪ দিন ধরে চিকিৎসকের নজরদারিতে এই প্রক্রিয়া চলে।
ডিম্বাণু পরিণত হলে আলট্রাসাউন্ডের সাহায্যে সূক্ষ্ম সুচের মাধ্যমে তা সংগ্রহ করা হয়। এরপর vitrification পদ্ধতিতে দ্রুত হিমায়িত করে তরল নাইট্রোজেনে প্রায় -১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়।

ভ্রূণ কী ভাবে সংরক্ষণ করা হয়?

ভ্রূণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও প্রথমে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। এরপর IVF বা ICSI পদ্ধতিতে শুক্রাণুর সঙ্গে নিষেক ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়।
ভ্রূণ কয়েক দিন পর্যবেক্ষণে রাখার পর উপযুক্ত পর্যায়ে পৌঁছলে সেটিকে vitrification পদ্ধতিতে হিমায়িত করে তরল নাইট্রোজেনে সংরক্ষণ করা যায়।

পরবর্তীতে প্রয়োজন হলে সেই ভ্রূণ গলিয়ে জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়।

ডিম্বাণু না ভ্রূণ—কোনটি বেশি সুবিধাজনক?

দুটিরই আলাদা সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ডিম্বাণু সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় সুবিধা, এতে ভবিষ্যতের সঙ্গী সম্পর্কে এখনই কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। নিজের ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখা যায় এবং পরবর্তী সময়ে পছন্দের শুক্রাণুর সঙ্গে নিষেক ঘটানো সম্ভব।
অন্য দিকে ভ্রূণ সংরক্ষণে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর নিষেক আগেই হয়ে যায়। ফলে ভবিষ্যতে ব্যবহার করার জন্য তৈরি ভ্রূণ হাতে থাকে। তবে এর জন্য একজন নির্দিষ্ট শুক্রাণুদাতা বা সঙ্গীর প্রয়োজন হয় এবং ভ্রূণের ব্যবহার নিয়ে ভবিষ্যতে দু’জনের সম্মতি ও আইনি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তাই কোন পদ্ধতি বেছে নেওয়া হবে, তা ব্যক্তির বয়স, ডিম্বাণুর মজুত, ভবিষ্যৎ মাতৃত্বের পরিকল্পনা, সঙ্গীর পরিস্থিতি এবং চিকিৎসাগত প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে।

ডিম্বাণু সংরক্ষণে খরচ কত?

কলকাতার বিভিন্ন হাসপাতাল ও ফার্টিলিটি ক্লিনিকে ডিম্বাণু সংরক্ষণের খরচ প্রায় ১.৫–২.৫ লাখ টাকা বা তার বেশি হতে পারে। এর মধ্যে পরীক্ষা, হরমোন ইঞ্জেকশন, ডিম্বাণু সংগ্রহ এবং হিমায়িত করার খরচ যুক্ত হতে পারে।
কতগুলি ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং কতগুলি সাইকেল প্রয়োজন হচ্ছে, তার উপর মোট খরচ বাড়তে পারে।
এর পাশাপাশি প্রতি বছর সংরক্ষণের জন্য আলাদা চার্জ দিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে এই খরচ বছরে প্রায় ১৫–২০ হাজার টাকা হতে পারে।

ভ্রূণ সংরক্ষণে কত টাকা খরচ?
ভ্রূণ তৈরি করতে IVF বা ICSI-এর প্রয়োজন হওয়ায় প্রাথমিক খরচ তুলনামূলক বেশি হতে পারে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ প্রায় ২.৫–৩ লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
তবে IVF-এর সময় অতিরিক্ত ভ্রূণ তৈরি হয়ে গেলে সেগুলি আলাদা করে ফ্রিজ় করার খরচ তুলনামূলক কম হতে পারে। ক্ষেত্রে বিশেষে তা প্রায় ১৫–৩৫ হাজার টাকা হতে পারে।
ভ্রূণ সংরক্ষণের জন্যও প্রতি বছর আলাদা স্টোরেজ চার্জ দিতে হয়, যা প্রায় ১৫–৩৫ হাজার টাকা হতে পারে।

সংরক্ষিত ডিম্বাণু বা ভ্রূণ কত দিন রাখা যায়?

আধুনিক vitrification পদ্ধতিতে ডিম্বাণু ও ভ্রূণ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব। তবে ঠিক কত বছর রাখা যাবে এবং পরে কী ভাবে ব্যবহার করা যাবে, তা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা এবং দেশের আইন ও নিয়মের উপর নির্ভর করে।
তাই শুধু খরচ বা প্রযুক্তির সুবিধা দেখেই সিদ্ধান্ত না নিয়ে আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

‘সোশ্যাল ফ্রিজ়িং’ কেন বাড়ছে?

প্রজননক্ষমতা সংরক্ষণের এই প্রবণতাকে অনেক সময় ‘সোশ্যাল ফ্রিজ়িং’ বলা হয়। কেরিয়ার, বিয়ে দেরিতে করা, সঠিক সঙ্গীর অপেক্ষা কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত—বিভিন্ন কারণে অনেক মহিলা এখন মাতৃত্ব পিছিয়ে দিতে চাইছেন।
তবে ডিম্বাণু বা ভ্রূণ সংরক্ষণকে ভবিষ্যতের মাতৃত্বের গ্যারান্টি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বয়সের সঙ্গে গর্ভধারণের অন্যান্য ঝুঁকি, জরায়ুর স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক শারীরিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা
ডিম্বাণু সংরক্ষণ এবং ভ্রূণ সংরক্ষণ—দুটিই প্রজননক্ষমতা ধরে রাখার আধুনিক পদ্ধতি। সঙ্গী নেই বা ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত এখনই নিতে চান না, এমন মহিলার জন্য ডিম্বাণু সংরক্ষণ বেশি উপযোগী হতে পারে। আর সঙ্গী রয়েছেন এবং ভবিষ্যতের সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা স্পষ্ট, তাঁদের ক্ষেত্রে ভ্রূণ সংরক্ষণ বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে বয়স, AMH, ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান, শুক্রাণুর মান এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিচার করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তাই সংরক্ষণের আগে অবশ্যই ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।

ঠোঁটের যত্নে খেজুরের রস, চুলে জবাফুল বাটা—মধ্যপ্রাচ্যের এই ৫ প্রাকৃতিক রূপচর্চার উপায় আজও সমান জনপ্রিয়

গুরুত্বপূর্ণ: ক্রায়োপ্রিজ়ারভেশন, ভ্রূণের ব্যবহার, সংরক্ষণের মেয়াদ ও ভ্রূণ দান/ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারতের প্রযোজ্য আইন এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে চলতে হয়।

শুধু হজম শক্তি বাড়িয়ে দেয় না, জোয়ান খেলে শরীরের অনেক সমস্যা নিবারণ হয় মুখরোচক বাদাম চিক্কি খেতে দারুন, বাড়িতেই তৈরী হবে, জানুন রেসিপি এইভাবে তেজপাতা পোড়ালে দুশ্চিন্তা কেটে যাবে 5 Best Night Creams ৪ মাসের শিশু ২৪০ কোটির মালিক