শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থক্ষেত্র পুরীর জগন্নাথ মন্দির বারবার আক্রমণের মুখে পড়েছে। লুঠ হয়েছে বিপুল ধনসম্পদ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মন্দিরের বিভিন্ন অংশ। তবুও আজও অটুট রয়েছে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার আরাধনা। ইতিহাস এবং লোকবিশ্বাস—দুইয়ের মিলিত ধারায় এই টিকে থাকার কাহিনি আজও বিস্ময় জাগায়।
ইতিহাসে ১৮ বার আক্রমণের উল্লেখ
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ৯ শতকে রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় গোবিন্দের সময় থেকে শুরু করে ১৭৩৩ সালে তকি খাঁর আক্রমণ পর্যন্ত মোট ১৮ বার পুরীর জগন্নাথ মন্দির আক্রান্ত হয়েছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আক্রমণকারীদের লক্ষ্য ছিল মন্দিরের রত্নভাণ্ডার লুঠ এবং বিগ্রহ ধ্বংস করা।
তবে প্রতিবারই এক অসাধারণ পরিকল্পনা ও সতর্কতার কারণে মূল বিগ্রহকে শত্রুর হাত থেকে নিরাপদে সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হন মন্দিরের সেবায়েতরা।
সেবায়েতদের দূরদর্শিতাই ছিল সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ
শত্রু আসার খবর পাওয়া মাত্রই গভীর রাতে গোপনে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার বিগ্রহ নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হত। কখনও চিল্কা হ্রদের নির্জন দ্বীপে, কখনও খুরদার জঙ্গলে, আবার কখনও কোনও গুহায় অস্থায়ীভাবে তাঁদের প্রতিষ্ঠা করা হতো।
লোকপ্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দীর্ঘ প্রায় ১৪৬ বছর বিভিন্ন সময়ে বিগ্রহকে অজ্ঞাতবাসে রেখে নিয়মিত গোপন পূজা চালিয়ে গিয়েছিলেন সেবায়েতরা। ফলে আক্রমণকারীরা মন্দিরে প্রবেশ করলেও মূল বিগ্রহ তাদের নাগালের বাইরে থেকেই যায়।
কালাপাহাড়ের আক্রমণ: সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়
১৫৬৮ সালে সুলাইমান কররানীর সেনাপতি কালাপাহাড়ের আক্রমণকে জগন্নাথ মন্দিরের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে ধরা হয়। ঐতিহাসিক ও লোককথা অনুসারে, সে মন্দিরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং বিগ্রহ পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
জনশ্রুতি রয়েছে, সেই সময় এক নিষ্ঠাবান ভক্ত দগ্ধ কাঠের মধ্য থেকে রহস্যময় ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ উদ্ধার করেন। পরে নতুন দারুবিগ্রহ নির্মাণের সময় সেই ব্রহ্ম পদার্থ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। যদিও এই ঘটনার অলৌকিক দিকটি মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোককথার অংশ।
আওরঙ্গজেবের আমলেও ব্যর্থ হয় বিগ্রহ ধ্বংসের চেষ্টা
১৬৯২ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে ওড়িশার নায়েব একরাম খাঁ পুরী আক্রমণ করেন। সেই সময়ও সেবায়েতরা কৌশল করে আসল বিগ্রহ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রেখে মন্দিরে কাঠের নকল বিগ্রহ স্থাপন করেছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে।
ফলে আক্রমণকারীরা মন্দিরের সম্পদ লুঠ করলেও মূল দারুব্রহ্মকে স্পর্শ করতে পারেনি।
আঘাত পেয়েছে মন্দির, অটুট থেকেছে বিশ্বাস
বারবার আক্রমণের কারণে বহু সময় জগন্নাথদেবকে মন্দির ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছে। তবুও গোপন স্থানে নিয়মিত পূজা ও ধর্মীয় আচার কখনও বন্ধ হয়নি। চিল্কার দ্বীপ, জঙ্গল কিংবা নির্জন আশ্রয়স্থলেও প্রদীপ জ্বেলে চলেছে মহাপ্রভুর আরাধনা।
এই কারণেই ইতিহাসের একের পর এক আক্রমণ সত্ত্বেও জগন্নাথের উপাসনা কখনও থেমে যায়নি।
ইতিহাস ও বিশ্বাসের অনন্য মেলবন্ধন
জগন্নাথ মন্দিরের আক্রমণের ইতিহাস যেমন বাস্তব, তেমনই দারুব্রহ্মকে ঘিরে বহু অলৌকিক কাহিনি আজও ভক্তদের বিশ্বাসের অংশ। ইতিহাসবিদরা যেখানে সেবায়েতদের অসাধারণ দূরদর্শিতা, গোপন পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে এই রক্ষার মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরেন, সেখানে ভক্তদের মতে এটি মহাপ্রভু জগন্নাথেরই অলৌকিক কৃপা।
আজও পুরীর নীলচক্রে পতিতপাবন বানা উড়ছে, আর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জগন্নাথ ধাম কোটি কোটি ভক্তের কাছে অটুট বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক হয়ে রয়েছে।এই লেখাটি ওয়েবসাইট প্রকাশের উপযোগী করে তথ্যভিত্তিক ও সহজপাঠ্য ভাষায় সাজানো হয়েছে, যেখানে ঐতিহাসিক তথ্য এবং লোকবিশ্বাস—দুটিকেই পৃথকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
Sumi has been waiting lifestyle, vastu Tips since 2026.