Recipe: রাজপ্রাসাদের বিলাসী রান্না নয়, কোনও শাহি দরবারের বাবুর্চির হাতের পদও নয়। শ্রমজীবী মানুষের কঠিন জীবন, অভাব আর লড়াইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাওজি মটনের ইতিহাস। তীব্র ঝাল, গাঢ় লাল ঝোল, মশলার ঝাঁঝ এবং উপরে ভেসে থাকা তেলের আস্তরণ—এই বৈশিষ্ট্যেই আজ সারা দেশে পরিচিত এই খাসির পদ।
কিন্তু জানেন কি, একসময় এটি ছিল মধ্যভারতের এক তাঁতি সম্প্রদায়ের ঘরোয়া খাবার? সেই খাবার কী ভাবে নাগপুরের গলি থেকে জনপ্রিয় হয়ে উঠল, তার নেপথ্যের ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ।
হালবা কোষ্টি কারা?
হালবা বা হলবা কোষ্টি মূলত মধ্যভারতের একটি জনগোষ্ঠী। তাঁদের বসতি ছত্তীসগঢ়, মধ্যপ্রদেশ, মালব অঞ্চল এবং ওড়িশা সংলগ্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিল। ‘কোষ্টি’ শব্দটি বস্ত্রশিল্প বা তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের পরিচয় বহন করে।
১৭ ও ১৮ শতকে এই সম্প্রদায়ের বহু মানুষ তাঁত বোনা ও সুতো কাটার পেশায় যুক্ত ছিলেন। উন্নত মানের সুতি ও সিল্কের কাপড় তৈরিতে তাঁদের যথেষ্ট দক্ষতা ছিল।
ব্রিটিশ আমলে বদলে গেল জীবন
ব্রিটিশ আমলে যন্ত্রে তৈরি সস্তা কাপড় বাজার দখল করতে শুরু করলে হাতের তাঁতে তৈরি কাপড়ের ব্যবসায় বড় ধাক্কা আসে। জীবিকা হারাতে শুরু করেন বহু হালবা তাঁতি। অনেকে ভিটেমাটি ছেড়ে কাজের সন্ধানে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন।
এই সময় তাঁদের একটি বড় অংশ নাগপুরে এসে বসতি গড়ে তোলে। সেখানে বস্ত্রশিল্পের প্রসার ঘটছিল। ফলে অনেকে কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
দিনভর কারখানায় কঠিন পরিশ্রমের পর প্রয়োজন ছিল এমন খাবারের, যা একই সঙ্গে পুষ্টিকর, ঝাল এবং পেটভরা। সেই প্রয়োজন থেকেই হালবা কোষ্টিদের রান্নাঘরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সাওজি মটন।
শ্রমিকের পেট ভরাত সাওজি মটন
শুরুতে সাওজি মটন ছিল একেবারেই ঘরোয়া রান্না। পরে হালবা সম্প্রদায়ের মহিলারা নাগপুরের রাস্তার ধারে ছোট দোকান বা খুপরি ঘরে এই মাংস বিক্রি করতে শুরু করেন।
রান্নায় মাংসের পরিমাণের তুলনায় ঝোল রাখা হত বেশি। উদ্দেশ্য ছিল, অল্প মাংস দিয়েও যেন প্রচুর ভাত বা রুটি খাওয়া যায়। ফলে সাওজি মটনের ঝোল হয়ে উঠল এই রান্নার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
২৪-৩২ মশলার বিশেষ সাওজি মশলা
এই রান্নার আসল স্বাদ লুকিয়ে রয়েছে সাওজি মশলায়। প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রায় ২৪ থেকে ৩২ ধরনের মশলা ব্যবহার করে এই মশলা তৈরি করা হয়।
পোস্ত, তিল, জায়ফল, জয়িত্রী, নারকেলকোরা, শাহি জিরে এবং বিভিন্ন গোটা গরমমশলার পাশাপাশি আরও নানা মশলার সংমিশ্রণ থাকে এতে। মশলার এই বিশেষ মিশ্রণই সাওজি মটনকে অন্যান্য কষা মাংসের থেকে আলাদা স্বাদ ও গন্ধ দেয়।
ঐতিহ্যগত ভাবে পেতলের হাঁড়ি বা কড়ায় ঢেকে ধীরে ধীরে মাংস রান্না করা হত। রান্নার শেষে ঝোলের উপর লালচে তেলের আস্তরণ দেখা যায়। কোনও কৃত্রিম রং নয়, দেশি মশলার ব্যবহারে আসে এর স্বাভাবিক গাঢ় রং।
বাড়িতেই বানাবেন সাওজি মটন
উপকরণ
*১ কেজি হাড় ও চর্বিসহ খাসির মাংস
*৪টি বড় পেঁয়াজ, কুচি করা
*৩ টেবিল চামচ আদা-রসুন বাটা
*প্রয়োজনমতো সাওজি মশলা
*২-৩ টেবিল চামচ শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো
*১ চা চামচ হলুদগুঁড়ো
*আধ কাপ সর্ষের তেল
*স্বাদমতো নুন
*প্রয়োজনমতো জল
*ধনেপাতা কুচি
রান্নার পদ্ধতি
প্রথমে মাংস ভালো করে ধুয়ে হলুদ, সামান্য নুন এবং আদা-রসুন বাটা দিয়ে মেখে ৩০-৪০ মিনিট রেখে দিন।
এর পর কড়ায় সর্ষের তেল গরম করে পেঁয়াজকুচি দিয়ে সোনালি করে ভেজে নিন। বাকি আদা-রসুন বাটা দিয়ে কিছুক্ষণ কষিয়ে লঙ্কার গুঁড়ো এবং সাওজি মশলা যোগ করুন। আঁচ কমিয়ে মশলা ভালো করে কষাতে থাকুন। মশলা যাতে পুড়ে না যায়, প্রয়োজনে অল্প গরম জল দিতে পারেন।
এ বার ম্যারিনেট করা মাংস কড়ায় দিয়ে তীব্র আঁচে ১০-১৫ মিনিট ভালো করে কষিয়ে নিন। মাংসের সঙ্গে মশলা ভালো ভাবে মিশে গেলে ফুটন্ত গরম জল দিন।
ঢাকনা দিয়ে পাত্রটি বন্ধ করে আঁচ একেবারে কমিয়ে ৪৫-৬০ মিনিট রান্না করুন। মাংস নরম হয়ে এলে এবং ঝোলের উপরে লালচে তেলের আস্তরণ ভেসে উঠলে ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে নামিয়ে নিন।
গরম ভাত, রুটি কিংবা রুটির মতো কোনও ভারতীয় রুটির সঙ্গে পরিবেশন করুন এই ঝালঝাল সাওজি মটন।
খাবারের স্বাদে লুকিয়ে ইতিহাস
আজ সাওজি মটন নাগপুরের অন্যতম পরিচিত খাবার এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও এর জনপ্রিয়তা রয়েছে। কিন্তু এই রান্নার স্বাদ শুধু মশলা আর মাংসের ঝাঁঝে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হালবা কোষ্টি সম্প্রদায়ের জীবিকা হারানো, নতুন শহরে এসে শ্রমিকের জীবন শুরু করা এবং কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেদের রান্নার ঐতিহ্য ধরে রাখার গল্প।
Recipe: ভূরিভোজের শেষপাতে পোস্তর চাটনি, অল্প উপকরণেই জমবে স্বাদ
তাই সাওজি মটন শুধু একটি মাংসের পদ নয়—এটি এক শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের সংগ্রাম, সংস্কৃতি এবং খাবারের ঐতিহ্যেরও স্বাদ।
Sumi has been waiting lifestyle, vastu Tips since 2026.